Dhaka Mail Logo

জাতীয়

মালদ্বীপে স্বস্তি: থামল ৫০ হাজার বাংলাদেশি বহিষ্কারের প্রক্রিয়া

বোরহান উদ্দিন

১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে দিন দিন বাড়ছে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা। কর্মসংস্থান, সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বড় ধরনের অসন্তোষ না থাকলেও দেশটির কঠোর অভিবাসননীতি, আইনি জটিলতা ও কোটাসংক্রান্ত কঠোর নীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগে আছেন সেখানে অবস্থানরত অর্ধলক্ষ বাংলাদেশি। বিশেষ করে অনিবন্ধিত ও কাগজপত্রের জটিলতায় থাকা কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল গণ-বহিষ্কারের (ডিপোর্টেশন) আতঙ্ক।

তবে ঢাকার জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতায় আপাতত সেই আতঙ্কে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে জানা গেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত মধ্যস্থতা এবং মালেতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ধারাবাহিক যোগাযোগের পর মালদ্বীপ সরকার বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

মালদ্বীপের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন দপ্তর ও ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, দুই দেশের এই কূটনৈতিক সমঝোতা শুধু প্রবাসীদের মাঝে স্বস্তি ও নতুন আশার আলোই জ্বালায়নি, বরং মালদ্বীপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান বজায় রাখতে এক নতুন দ্বিপক্ষীয় দুয়ার খুলে দিয়েছে।

maldives2-
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা মালদ্বীপ অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে গঠিত।

মালের অভিবাসন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মালদ্বীপের বিদ্যমান অভিবাসন নীতি ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখের বেশি বিদেশি কর্মী নিয়োগের ওপর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বর্তমানে দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। নির্ধারিত এই সীমা প্রায় ৫০ হাজার অতিক্রম করায় শুধু অনিবন্ধিত কর্মীই নন, বরং জাতীয়তার কোটা ব্যবস্থাপনার জটিলতায় পড়ে বৈধভাবে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকের অবস্থানও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। সংকটময় এই পরিস্থিতিতে মালেস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলামের শুরুর দিকে মধ্যস্থতা ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগে মূল ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে প্রবাসীদের এই সংবেদনশীল বিষয়টি সমাধানে যুক্ত হয় উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক মালদ্বীপ সফর এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সফল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে পুরো পরিস্থিতির মোড় ঘোরে বলে জানা গেছে। কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, মালদ্বীপের অর্থনীতি মূলত শ্রমনির্ভর। বিশেষ করে সেদেশের সবচেয়ে লাভজনক পর্যটন ও রিসোর্ট শিল্প, অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের অবদান অপরিহার্য। হুট করে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে ফেরত পাঠালে তা কেবল মানবিক সংকট তৈরি করবে না, বরং মালদ্বীপের উদীয়মান অর্থনীতিতেও বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের এই যৌক্তিক অবস্থান অনুধাবন করে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত স্থগিতের পথে হাঁটে মালদ্বীপ সরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাউথ এশিয়া উইংয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সফল কূটনৈতিক দরকষাকষির ফলেই আপাতত ডিপোর্টেশন স্থগিত রয়েছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য অনিবন্ধিত প্রবাসীদের নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে নতুন শ্রমচুক্তি সম্পাদন করা।’

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাময়িক এই স্থগিতাদেশ বাংলাদেশ সরকারের শ্রম কূটনীতির জন্য বড় অর্জন হলেও বিষয়টিকে স্থায়ী সমাধানে রূপ দিতে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিতে হবে। একইসঙ্গে প্রথাগত অদক্ষ বা সাধারণ শ্রমিক পাঠানোর বদলে হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও আইটি খাতে প্রশিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি অনিবন্ধিত প্রবাসীদের বৈধ কাঠামোর আওতায় আনতে দ্রুত বিশেষ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর, প্রবাসীদের নির্ভুল তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডেটাবেজ তৈরি এবং দুই দেশের প্রবাসী কল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক ডায়লগ চালু রাখা প্রয়োজন। এই কূটনৈতিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে মালদ্বীপের সঙ্গে একটি সমন্বিত ও টেকসই দ্বিপক্ষীয় শ্রম চুক্তি সই করাই এখন ঢাকার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

maldipঅভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘কূটনৈতিকভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যদি এমন সিদ্ধান্ত আসে সেটা খুবই ভালো কাজ। তবে এটা হয়তো সাময়িক। এটাকে স্থায়ী করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। মালদ্বীপের সঙ্গে যে চুক্তি আছে সেটা আরও আপডেট করে যাতে শ্রমিক আরও যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নতুন করে কোন কোন খাতে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো যায়, সেখানে সংখ্যার বিষয়টি এভয়েড করা যায় কিনা দেখতে হবে। না হলে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কত শ্রমিক দেশটিতে যেতে পারবে সেই চেষ্টা করা যেতে পারে। এই তথ্যটা দেশটিতে যারা আছেন তাদের এবং যারা যেতে চান তাদেরকেও অবহিত করতে হবে, আসলে নিয়মটা কি করা হচ্ছে। না হলে তারা উদ্বেগ নিয়েই থাকবেন।’

বিইউ/এমআর