কেমন আছেন মালদ্বীপের বাংলাদেশিরা

হারুন জামিল মালদ্বীপ থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২২, ০৬:১৮ পিএম
কেমন আছেন মালদ্বীপের বাংলাদেশিরা

মালদ্বীপে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা লক্ষাধিক। যত সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক দেশটিতে কাজ করেন বাংলাদেশের শ্রমিক তার প্রায় ৭০ শতাংশ। দেশটির শ্রমঘন খাতে নিয়োজিতদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি। নির্মাণ শিল্প, মৎস ও কুটির শিল্প, হোটেল ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং রিসোর্টে কর্মরতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের লোক। নির্মাণ শিল্প বাংলাদেশের শ্রমিক ছাড়া চলতে পারবে না। একইভাবে পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং হোটেল কর্মচারীর ভেতর থেকে বাংলাদেশিরা বাদ পড়লে মালদ্বীপে সংকট দেখা দেবে।

রাজধানী মালে থেকে ১৩৬ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের হুরুভালি আইল্যান্ডের স্ট্যান্ডার্ড রিসোর্টের তিনশ কর্মচারীর মধ্যে ৪৫ জনই বাংলাদেশি। বাকিরা ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়ান, শ্রীলঙ্কান, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশের অধিবাসী। এসব শ্রমিক কয়েক বছর যাবত দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশিরা শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাছাই হয়ে মালদ্বীপ গেছেন। ফলে তাদের হয়রানি যেমন কম হয়েছে ঠিক তেমনি টাকা খরচও কম হয়েছে।

মালদ্বীপের রাজধানী মালে এবং অন্যান্য স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা এখানে যে টাকা আয় করেন একই কাজে অন্য দেশের শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বেশি। কিন্তু অর্থ কম লাগায় মালদ্বীপের মালিকরা বাংলাদেশিদের প্রাধান্য দেন। যে লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক মালদ্বীপে কাজ করছেন এরমধ্যে ৫০ হাজার আছেন যাদের বৈধ ওয়ার্কপারমিট নেই। মালিকরা এসব সুযোগ কাজে লাগান। বৈধতা না থাকায় তারা ঠকলেও আইনে কোনো প্রতিকারের সুযোগ থাকে না। করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার আগে থেকেই মালদ্বীপ বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিছুদিন পূর্বে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে কথাবার্তা হলেও এখনও চালু হয়নি।

maldip-1

হুরুভালি দ্বীপে কথা হয় মাদারীপুরের কালকিনির মোহাম্মদ শামীমের সাথে। আটাশ বছর বয়সী শামীম বললেন, চার বছর ধরে তিনি এখানে আছেন। বছরে একবার ৪৫ দিনের জন্য ছুটি পান। বেতন ৩০০ মার্কিন ডলার। এর ওপর কোম্পানির আয়ের ১০ শতাংশ তারা সমভাবে সবাই পান। সব মিলিয়ে ৫০০ ডলারের মতো ইনকাম হয়। আমেরিকা ও মালদ্বীপের যৌথ উদ্যোগের পাঁচতারকা মানের রিসোর্টটিতে সবার বেতন একই সিস্টেমে হয়। তবে দায়িত্ব অনুযায়ী কিছুটা তারতম্য আছে।

টঙ্গীর মোহাম্মদ রাব্বির বয়স ২৫ বছর। এখানে ওয়েটার হিসেবে কাজ করেন। টঙ্গী কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়ই পরীক্ষা না দিয়ে চলে এসেছেন পরিবারের সংকটে। তারও বেতন তিনশ ডলার।

চাঁদপুরের সাখাওয়াত ও মানিক, ভোলার সালাহউদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রকি এরা সবাই এই দ্বীপে কাজ করেন। ঢাকা মেইলকে তারা বলছিলেন, নির্জনতা এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা ছাড়া এখানে তাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে সময় পেলেই তারা মোবাইলে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। আপনজনদের খোঁজখবর নেন।

maldip2

হুরুভালি থেকে কয়েক কিলোমিটার ভারত মহাসাগরের গভীর সমুদ্রে ইয়েদাপুষি নামের একটি আইল্যান্ড রয়েছে। এখানে সম্প্রতি একটি অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর নির্মাণে হাত দিয়েছে মালদ্বীপ। এই বিমান বন্দর নির্মাণে নিয়োজিতদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের শ্রমিক। নিকটের ধারাবান্দু আইল্যান্ডেও প্রচুরসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। এই আইল্যান্ডে স্কুল কলেজ হসপিটাল ও কমিউনিটিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আশপাশের দ্বীপে স্বাস্থ্য সমস্যাসহ কোনো সংকট দেখা দিলে লোকজন সেখানেই ছুটে আসেন। দ্বীপগুলোর মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র উপায় জাহাজ ও স্পিডবোট। প্রায় সব দ্বীপেই স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। পানি পরিশোনাগারের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ হয়।

বাংলাদেশিদের কাজে সুনাম আছে। এছাড়া তারা নিরীহ ও শান্ত স্বভাবের বলে মালদ্বীপের লোকজন তাদের সমীহ করেন। তবে বৈধ কাগজপত্র না থাকলে অনেক সময় মালিকরা সে সুযোগ নিয়ে ঠকানোর দুর্নাম রয়েছে। মরক্কোর অধিবাসী মোহাম্মদ ইউসুফের কাছে বাংলাদেশিদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরা খুবই মিশুক। পরোপকারী এবং পরিশ্রমী। তার সাথে যেসব বাংলাদেশির পরিচয় হয়েছে তারা প্রত্যেকে খুবই চমৎকার মানুষ বলে জানালেন তিনি।

জেবি