বোরহান উদ্দিন
১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৩ এএম
# প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পেরে উঠছেন না মন্ত্রীরা, ভঙ্গুর দশা পুলিশ-প্রশাসনে
# জননিরাপত্তায় উদ্বেগের ছায়া, শৃঙ্খলা ফেরেনি দলের তৃণমূলে
# সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তন
# ১৮০ দিনেই মন্ত্রিসভায় রদবদলের হাওয়া
দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের মতো ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি সবশেষ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে ছয় মাস পূর্ণ করছে আজ সোমবার। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অর্থনৈতিক সংকট, দুর্বল ব্যাংক খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অনিয়ন্ত্রিত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার মতো বিশাল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে শুরু হয় বর্তমান সরকারের যাত্রা।
দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম ১৮০ দিনের বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ‘রকেট’ গতিতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন তিনি। নিজ হাতে কোদাল নিয়ে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ করে মানুষকে উৎসাহিত করে চলেছেন। সপ্তাহের হাতে গোনা দু-এক দিন ছাড়া ছুটির দিনেও প্রশাসনিক কাজ অব্যাহত রেখেছেন।
তবে এই ১৮০ দিনের গতিপথে সবচেয়ে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সরকারের সামাজিক সুরক্ষাকেন্দ্রিক গণমুখী পদক্ষেপ এবং অর্থনীতিতে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা। সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার ও প্রবাসী আয়ের গতি এনে সরকার যেমন বহির্বিশ্বে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানিসংকট এবং মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণহীনতা সরকারের ভাবমূর্তিকে চাপে রাখছে।
সামাজিক নিরাপত্তায় বিশেষ জোর: ফ্যামিলি কার্ড থেকে কৃষিঋণ মওকুফ
গত ছয় মাসের সরকারি কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে নজর দিলেও সামাজিক সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে জরুরি কিছু সেবা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এটিকে সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন।
যদিও সামাজিক এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরুর পর মাঠ পর্যায়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যা স্বস্তির বদলে কিছুটা অস্বস্তি দেখা দিয়েছে শুরুতেই।
গত ছয় মাসে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এবং গৃহস্থালি অর্থনীতিতে গতি আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই উদ্যোগের ব্যাপক প্রশংসা করেছে। কার্ড বিতরণে কারিগরি অসঙ্গতি এড়াতে তথ্যভাণ্ডার নতুন করে সাজানো ও বাছাই প্রক্রিয়া সংস্কারের কাজ চলছে।
এদিকে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই প্রান্তিক কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে সুদে-আসলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে, যার মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হয়েছেন ১৩ লাখের বেশি কৃষক। এছাড়া চালু করা হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’।
এছাড়াও দেশের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রধানদের জন্য সরকারি ভাতা চালুর কার্যকরী পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান রূপ নিয়েছে।
এর বাইরে সরাসরি করের চাপ না বাড়িয়ে দায়িত্ব গ্রহণের সাড়ে তিন মাসের মাথায় ঘোষিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি ও দরিদ্র, প্রান্তিক, নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক স্বস্তি ও বৈদেশিক রিজার্ভে ইতিবাচক ধারা
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরার সংকেত মিলছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় উত্থান পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি (BPM6) অনুসারে দেশের নিট বা ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ৩২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে (যেখানে মোট বা গ্রস রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার)। রিজার্ভের এই শক্ত অবস্থান সরকারের ভঙ্গুর অর্থনীতি কাটিয়ে ওঠার একটি বড় সাফল্য।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ভ্রমণের জন্য নিরাপদ বলে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত সরকারও ভিসা জটিলতা নিরসনে সুখবর দিয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য সম্ভাবনা ও মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা চলতি আগস্টের শেষে চালু হলে পরবর্তী চার মাসে লাখেরও বেশি কর্মীর কর্মসংস্থান হবে।
এছাড়া জাপান, ওমান, জর্ডান ও ইউরোপের বাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে জামানতহীন বিশেষ ঋণ ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে বেপরোয়া তৃণমূল, আইনি ও প্রশাসনিক স্থবিরতা
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সদিচ্ছা এবং কঠোর বার্তা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর বেপরোয়া আচরণের কারণে। গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত-সংঘর্ষের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধে প্রাণ হারিয়েছেন নিজ দলের একাধিক কর্মী ও সমর্থক। তৃণমূলের এই বিশৃঙ্খলা সরকারের রাজনৈতিক অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। পুলিশের ভঙ্গুর অবস্থা ও আস্থার সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অভিযোগ রয়েছে, বাহিনীর ভেতরে ও প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা বিগত সরকারের সুবিধাবাদী অংশ নেপথ্যে থেকে সরকারকে বিব্রত করতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা বিধানে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে প্রশাসনের সব স্তরে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গতিহীনতা দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: হঠাৎ কেন ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে দেশ?
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সামগ্রিক মূল্যায়নে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ঢাকা মেইল বলেন, ‘সরকার ছয় মাসে সামাজিক সুরক্ষা খাতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জরুরিভাবে মানুষকে বেশ কিছু সেবা দেওয়ার দরকার ছিল—তা সফলভাবে করেছে। ফ্যামিলি কার্ড থেকে শুরু করে সামাজিক সুরক্ষায় কার্যকরী উদ্যোগগুলো ইতিবাচক। তবে জ্বালানিসংকট, দ্রব্যমূল্য ও মানুষের নিরাপত্তাসংকট এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।’
রাজনীতির মাঠ, ‘রেইনবো নেশন’ ও মন্ত্রিসভার সামঞ্জস্য
রাজনীতির মাঠে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় বিল আকারে সংসদে উত্থাপন এবং শরিক দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও স্পষ্ট করার তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া সরকার যে ‘রেইনবো নেশন’ বা বহুদলীয় ঐক্যের ধারণা সামনে এনেছিল, তা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রশাসনে আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী যে গতিতে এগোচ্ছেন, মন্ত্রিসভার সবাই সমান গতি বজায় রাখতে পারছেন না। অনভিজ্ঞতা ও অতিরঞ্জিত বক্তব্যের কারণে একাধিক মন্ত্রী বিভিন্ন সময় আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। পাশাপাশি একাধিক মন্ত্রীর হাতে একাধিক দপ্তর থাকায় প্রশাসনিক চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় ১৮০ দিন পূর্তিতে কাজের গতি বাড়াতে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হওয়া ও দপ্তর রদবদলের জোরালো আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারের ৬ মাস পূর্তির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, দেড় দশকের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ চলছে। শত উস্কানির মধ্যেও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার রোডম্যাপ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগের সরকারের রেখে যাওয়া সংকট মোকাবিলায় বিশ্বস্ত অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সততা, দায়বদ্ধতা ও জনম্যান্ডেটকে সম্বল করে বাংলাদেশ খুব দ্রুত একটি স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
বিইউ/এমআর