মহিউদ্দিন রাব্বানি
১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৫ এএম
# গ্যাসের জন্য বদলে গেছে কর্মঘণ্টা, কাজ হারাচ্ছেন অনেকে
# ইলেকট্রিক চুলাতেও স্বস্তি নেই, নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা লাকড়ি
# চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি
# সামিট থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু, সংকট কাটার অপেক্ষায় রাজধানীবাসী
রাজধানীর বাসাবোর বাসিন্দা সাজেদা বেগম বিভিন্ন মেসে রান্নার কাজ করেন। সাধারণত সকালে রান্নার কাজ শেষ করেন দুপুরের আগেই। আর রাতের রান্না করেন বিকেল বা সন্ধ্যায়। কিন্তু বাসাবাড়িতে গ্যাসের তীব্র সংকট তার সেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে।
এখন সকালের রান্নার কাজ শেষ করতে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আর সন্ধ্যার রান্নার কাজ করতে হচ্ছে রাত ৯টা থেকে ১০টার দিকে। রাত করে কাজ করতে স্বামীও দিতে চান না। ইতোমধ্যে গ্যাসের অভাবে একটি বাড়ির রান্নার কাজও হারিয়েছেন তিনি।
সাজেদার মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের রান্নাঘরেও এখন একই চিত্র। দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ থাকে না। কোথাও সকাল থেকে গ্যাস মিলছে না, কোথাও আবার গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস আসছে। ফলে রান্নার সময় বদলে গেছে অনেক পরিবারের। কেউ গভীর রাতে রান্না করছেন, কেউ হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। আবার নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে লাকড়ির চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, বনশ্রী, উত্তরা, মিরপুর, বাসাবো, বাড্ডা, বনশ্রী ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের তীব্র সংকটের কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
সকাল থেকে গ্যাস নেই, রাতে মেলে অল্প সময়
গণমাধ্যমকর্মী নিশীতা মিতু নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘সকাল ৭টায়ও গ্যাস নাই, দুপুর ২টায়ও নাই, রাতের ৯টায়ও নাই। দেখা মেলে রাত ১২টার পর। ফজরের সময় তা শেষ।’
আরও পড়ুন: গ্যাস সরবরাহ নিয়ে সুখবর দিল সামিট
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে মানুষ ইলেকট্রিক চুলা কিনলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সেখানেও স্বস্তি মিলছে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। ফলে গ্যাস সংকট এখন শুধু রান্নাঘরের সমস্যা নয়, রাজধানীর বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও আয়ের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ডেমরার গৃহবধূ সেলিনা আহমেদ বলেন, ‘গ্যাস টোটালি বন্ধ। বারবার চুলা জ্বালিয়ে চেষ্টা করলেও গ্যাস পাওয়া যায় না। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে এই দুর্ভোগ। এখন এমন অবস্থা, গ্যাসই নেই।’
তিনি বলেন, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। কিন্তু রান্নার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে নতুন করে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।
রামপুরার বাসিন্দা ময়মুনা বেগম বলেন, ‘গ্যাসই জ্বলে না, কী আর রান্না করব। আগে রাতে একটু করে আসত। কিন্তু এখন রাত-দিন সমান হয়ে গেছে। ইলেকট্রিক চুলা ছাড়া রান্না করা যাচ্ছে না।’
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সাইফুল জানান, সকাল থেকে চুলায় গ্যাস থাকে না। কখনো হোটেল থেকে খাবার আনতে হচ্ছে, আবার কখনো রাতে অল্প গ্যাস এলে তখন রান্না করছেন। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে পানি তোলাও সম্ভব হচ্ছে না।
লাকড়ির চুলায় ফিরছেন নিম্ন আয়ের মানুষ
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করা সম্ভব হলেও নিম্ন আয়ের অনেক পরিবারের পক্ষে সেটি কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কেউ লাকড়ির চুলায় রান্না করছেন, কেউ অন্যের বাসা বা হোটেল থেকে খাবার এনে খাচ্ছেন।
বাড্ডার গৃহবধূ সাদিয়া জাহান বলেন, ‘লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছি আমরা। গ্যাস না থাকায় এভাবে রান্না করতে হচ্ছে। আমাদের মতো গরিব মানুষ ইলেকট্রিক চুলা কিনতে পারে না।’
গ্যাস সংকটের কারণে শুধু রান্নার সময়ই বদলাচ্ছে না, অনেকের কাজের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। সাজেদা বেগমের মতো যারা অন্যের বাসায় রান্নার কাজ করে জীবিকা চালান, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
গ্যাসের জন্য বদলে গেছে কর্মঘণ্টা
বাসাবোর সাজেদা বেগম জানান, আগে সকালে রান্নার কাজ শেষ করে অন্য বাড়িতে যেতেন। সন্ধ্যার রান্নার কাজও বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যেই শেষ করতেন। এখন গ্যাস কখন আসবে, সেটার ওপর নির্ভর করে তাকে কাজের সময় ঠিক করতে হচ্ছে।
সকালের কাজ শেষ করতে এখন দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আবার সন্ধ্যার রান্না করতে হচ্ছে রাত ৯টা বা ১০টার দিকে। কিন্তু রাতে বাইরে গিয়ে কাজ করতে স্বামী বাধা দেন। ফলে গ্যাস সংকটের কারণে একটি বাড়ির রান্নার কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছে তাকে।
তার মতো রান্নার কাজ করে জীবিকা চালানো অনেক নারীই গ্যাস সংকটে কাজের সময় ঠিক রাখতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।
তিতাসের চাহিদা ১,৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি
তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) সাইদুল হাসান বলেন, সামিটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তিতাস প্রায় ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছে। অথচ তিতাসের অধীন এলাকায় গ্যাসের চাহিদা ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি।

তিনি বলেন, এলএনজি সমস্যার আগে ২১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে বর্তমানে সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এলএনজি না আসা পর্যন্ত খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। আবহাওয়া ভালো হলে দুই-এক দিনের মধ্যে সামিটের এলএনজি পাওয়া যেতে পারে। সেটি পাওয়া গেলে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে কিছুটা ঘাটতি কাটবে বলে আশা করছি।’
সামিট থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু
তবে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় সামিট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়িয়ে ১৫ আগস্ট রাত ২টার দিকে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে।
সামিটের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই গ্যাস সরবরাহ শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য গ্রাহকের গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়াতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা এবং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতেও এটি ভূমিকা রাখবে।
এলএনজি সংকটেই কমেছে গ্যাস সরবরাহ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যা। দেশের এলএনজি সরবরাহ দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ কমে যায়। এর মধ্যে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্য টার্মিনাল থেকেও স্বাভাবিকভাবে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর বাসাবাড়িতে। দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক বাসায় চুলা জ্বালানো যাচ্ছে না। কোথাও আবার গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে রান্নার স্বাভাবিক সময়সূচি বদলে গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ
জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি নতুন করে দেড়শ কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের দায় বর্তমান সরকারের নয়।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশীয় উৎপাদন ঘাটতির কারণে গ্যাস আমদানি করতে হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় রাতারাতি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়।
বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। গ্যাস আমদানি বাড়াতে ২০২৪ সালে সামিট গ্রুপের সঙ্গে তৃতীয় একটি এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি হলেও পরে তা বাতিল করা হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল বাতিলের ফলে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত প্রস্তুতির দিক থেকে দুই-তিন বছর পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নতুন করে চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার চুক্তিতে দুই বছরের মধ্যে একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় লাগবে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীর বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট কতটা কমে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
এমআর/এআরএম