রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
২০২৪ সালের জুন। তপ্ত রাজপথের পাশাপাশি বাংলাদেশের উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণও তখন হয়ে উঠেছিল আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের রায় থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি বন্ধের আবেদন—আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়েই উচ্চ আদালতে ছিল নানা নাটকীয়তা।
জুন থেকে আগস্টের সেই উত্তাল সময়ে উচ্চ আদালতে কী ঘটেছিল, তার কিছু ঘটনা উঠে এসেছে তৎকালীন রিট মামলার আইনজীবী ও বর্তমানে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হকের বক্তব্যে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৫ জুন। ওই দিন ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারের জারি করা কোটা বাতিলের পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। এর ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ আগের কোটা ব্যবস্থা ফিরে আসে। রায়ের পরই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।
আরও পড়ুন: চোখ হারিয়ে জীবনযুদ্ধে তিন জুলাইযোদ্ধা
সরকারপক্ষ ৯ জুন রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে। তৎকালীন চেম্বার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বিষয়টি ৪ জুলাই আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।
৪ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে নট টুডে আদেশ দেন। ওই দিন আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করে প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, আন্দোলনের চাপ দিয়ে কি সুপ্রিম কোর্টের রায় পরিবর্তন করবেন?
১৪ জুলাই হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ১৬ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২১ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে পূরণের নির্দেশ দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য কোটায় ২ শতাংশ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজত ও গুলি বন্ধের আবেদন
আন্দোলন যখন চরমে, তখন ২৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন ও আইনুন্নাহার সিদ্দিকা (বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি)।
কিন্তু ৩০ ও ৩১ জুলাই এই রিটের শুনানি চলাকালে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দ্বৈত বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসাইন দোলন হঠাৎ অসুস্থতার কথা বলে ছুটিতে চলে যাওয়ায় শুনানি পিছিয়ে যায়। আইন অঙ্গনে জোর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, আদেশ যাতে সরকারের বিপক্ষে না যায়, সেজন্য বিচারকের ওপর ডিজিটাল ও অন্যান্য মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
তৎকালীন রিট মামলার অন্যতম আইনজীবী ও বর্তমান অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, আদালতকক্ষে সরকার-সমর্থক আইনজীবীদের কর্মকাণ্ড ছিল রীতিমতো নজিরবিহীন।
আইনজীবী অনিক আর হকের ভাষ্যমতে, শুনানির সময় আমাদের বসার বেঞ্চগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একজন প্রবীণ আইনজীবীকে টানা তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। এমনকি প্রবীণ আইনজীবী মনজুরুল হকের ওপর হাত তোলা হয়েছিল এবং তাঁর হাত থেকে রক্ত পর্যন্ত বের করে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, বিচারপতি কাজী রেজাউল হক বিশৃঙ্খলাকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও তারা কোনো তোয়াক্কা করেনি। বিচারপতির ওপর এতটাই চাপ ছিল যে, রিটের আদেশে স্বাক্ষর না করেই একপর্যায়ে বিচারকেরা এজলাস ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
৪ আগস্ট: রিট খারিজ ও রাজপথের রণক্ষেত্র
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ৪ আগস্ট বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনের বেঞ্চ গুলি না চালানোর রিটটি খারিজ করে দেন। তবে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) মেনে জীবন রক্ষার সর্বশেষ ধাপ হিসেবেই কেবল গুলি চালানো যাবে, নির্বিচারে নয়।
রিট খারিজ হওয়ার মুহূর্তটি ছিল থমথমে। আইনজীবী অনিক আর হক বলেন, রিট খারিজ হওয়ার পর আমরা আদালতকক্ষ থেকে বের হওয়ার আগেই দেখি পুরো প্রাঙ্গণ পুলিশ ও গাড়ি দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। আমরা সাংবাদিকদের কাছে যাওয়ার আগেই বাইরে গুলির শব্দ শুনতে পাই।
একই দিনে ডিবি হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়ককে আন্দোলনের মুখে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। আদালতের এই আইনি লড়াই এবং রাজপথের সংঘাত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অবশেষে ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।
জুন থেকে আগস্টের এই কালপর্বটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও রাজপথের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে টিকে থাকবে, যা পরবর্তী সরকার পতনের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
আরএনবি/এআর