বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

চোখ হারিয়ে জীবনযুদ্ধে তিন জুলাইযোদ্ধা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

চোখ হারিয়ে জীবনযুদ্ধে তিন জুলাই যোদ্ধা
জীবনযুদ্ধে তিন জুলাইযোদ্ধা— মাহবুব, সাব্বির ও রাব্বী। ছবি: ঢাকা মেইল
  • চোখ হারিয়ে স্ত্রীও হারিয়েছেন মাহবুব, ঋণে জর্জরিত
  • চাকরি হারিয়ে ভাতা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালান সাব্বির
  • ইতালির ভিসা হলেও যেতে পারেননি রাব্বী

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ও নিহত ব্যক্তিদের অনেকের গল্পই সামনে এসেছে। তবে সেই আন্দোলনে অংশ নিয়ে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিদের জীবনসংগ্রামের কথা তুলনামূলকভাবে কমই আলোচিত হয়েছে। একসময় কেউ ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, কেউ করপোরেট চাকরিজীবী, আবার কেউ বিদেশে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিলেন। আন্দোলনের সময় গুলিতে চোখ হারানোর পর তাঁদের জীবন এক মুহূর্তেই বদলে গেছে।

এখন তাঁদের কারও চলাফেরার জন্য অন্যের সহায়তা প্রয়োজন, কারও ব্যবসা বন্ধ, কেউ হারিয়েছেন চাকরি। চিকিৎসা, সংসার চালানো, সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়েই তাঁদের প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে। কারও কারও ব্যক্তিজীবনেও নেমে এসেছে বড় বিপর্যয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও তাঁদের অনেকেরই অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা সমাজের মনোযোগের বাইরে চলে যাচ্ছেন।

চোখ হারিয়ে স্ত্রীও হারিয়েছেন মাহবুব

চোখ হারানো ব্যক্তিদের একজন নারায়ণগঞ্জের মাহবুব আলম (২৯)। একসময় বাবার ব্যবসার হাল ধরে সফলভাবেই এগিয়ে নিচ্ছিলেন পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় আন্দোলনে গিয়ে দুই চোখ হারানোর পর তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে যায়।

image

মাহবুব জানান, সেদিন পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেলে কয়েকজন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিয়ে তিনি রাস্তার পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পরে আবার পুলিশ ধাওয়া দিলে তিনি অন্যদের সঙ্গে হকার্স মার্কেটের পাশের একটি গলিতে আশ্রয় নেন। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি দেখতে উঁকি দিতেই পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি তাঁর দুই চোখে আঘাত করে। মাথার ভেতরে ঢুকে যায় ৪১টি ছররা গুলি, যার বেশির ভাগই এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। প্রথমে তাঁকে নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারত, থাইল্যান্ড ও চীনেও গিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানান, খুব দেরি হয়ে গেছে। ফলে সেই চোখে আর আলো ফেরানো সম্ভব নয়।

শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও বড় ধাক্কা আসে। চোখ হারানোর মাত্র চার মাস পর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান।

মাহবুব বলছিলেন, সে (প্রথম স্ত্রী) একপ্রকার প্রতারণা করেই চলে গেছে। তবে আল্লাহ আমাকে নতুন জীবনসঙ্গী দিয়েছেন। সব জেনেশুনেই তিনি আমাকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু এখন চলাফেরার জন্য স্ত্রী ছাড়াও একজন সহকারী রাখতে হয়। তাঁকে প্রতি মাসে টাকা দিতে হয়, যা জুলাই যোদ্ধার ভাতা থেকেই দিতে হয়। কিন্তু সেই ভাতায় সংসার চলে না।

একসময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো মাহবুব এখন নিজেই অসহায়। বাবার অসুস্থতায় বড় অপারেশন, ব্যবসায় লোকসান এবং আটকে থাকা পাওনা—সব মিলিয়ে তাঁদের পরিবারের ওপর এখন দেড় কোটিরও বেশি টাকার ঋণের বোঝা।

তাঁর ভাষায়, আমি সুতা সরবরাহের ব্যবসা করতাম। এখন কোথাও যেতে পারি না। তাই ব্যবসাও প্রায় বন্ধ। একজনের কাছে বড় অঙ্কের টাকা পাওনা রয়েছে। কিন্তু বারবার ঘুরিয়েও তা উদ্ধার করতে পারছি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারতাম, তাহলে অন্তত পাওনা টাকা আদায়ে সহযোগিতা চাইতাম।

করপোরেট চাকরি থেকে বেকার জীবন সাব্বিরের

কুমিল্লার লালমাই উপজেলার সাব্বির আহমেদ (২৭)। জুলাই আন্দোলনের সময় আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। পাশাপাশি একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। তাঁর উপার্জনেই পরিবারের ব্যয় নির্বাহ হতো। কিন্তু চোখ হারানোর পর চাকরিও হারিয়েছেন তিনি।

image

সাব্বির বলেন, এখন আমি পুরোপুরি বেকার। দুই চোখেই দেখতে পাই না। জুলাইয়ের ভাতা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলছে। ভালোভাবে খাওয়া কিংবা পোশাক কেনার সুযোগও নেই।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সোনারগাঁও এলাকায় আন্দোলনের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তাঁর দাবি, ওয়াসা ভবনের দিক থেকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ব্যক্তিরা গুলি চালালে একটি গুলি কপালের পাশ দিয়ে ঢুকে চোখ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। এতে চোখের রেটিনা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে এবং পরে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। এরপর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) প্রায় এক মাস চিকিৎসা নিলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি বলে জানান তিনি।

সাব্বির স্মৃতিচারণ করে বলেন, চক্ষুবিজ্ঞান থেকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়ার পর চোখ দিয়ে রক্ত পড়া থামছিল না। অসহ্য ব্যথা কমাতে চিকিৎসকেরা কয়েক দফা অ্যানেসথেশিয়া দিয়েও কাজ হয়নি। পরে জানতে পারি, চোখের রেটিনা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, সেদিন কার গুলি লেগেছিল, সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কারণ সেখানে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ—সব পক্ষই ছিল। আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা আর মানুষকে গুলি করে হত্যার ঘটনা দেখে ঘরে বসে থাকতে পারিনি।

ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গেছে রাব্বীর

রাজধানীর শনিরআখড়ার বাসিন্দা মহিউদ্দিন রাব্বীর স্বপ্ন ছিল ইতালি যাওয়ার। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসার প্রস্তুতিও শেষ হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনের একটি দিন তাঁর জীবনের সব হিসাব বদলে দেয়।

image

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে যাত্রাবাড়ী থানার দিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যাওয়ার সময় পুলিশ গুলি চালায়। প্রথম গুলিতে তাঁর মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে। গুলি পেছন দিয়ে ঢুকে দুটি হাড় ভেঙে শরীরের ভেতর আটকে যায়। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও তাঁকে আরও দুই দফা গুলি করা হয়। এতে ডান চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আন্দোলনকারীরা প্রথমে তাঁকে মৃত ভেবে ভ্যানে তুললেও চিৎকার শুনে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। দীর্ঘ দেড় বছরের চিকিৎসার পর কিছুটা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারলেও ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফেরেনি।

রাব্বী বলেন, চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পর্যন্ত গিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছেন, ডান চোখে আর কোনোদিন আলো ফিরবে না। চোখের নার্ভগুলো সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য একজনকে ১৪ লাখ টাকা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই অর্থও এখনো ফেরত পাননি। অন্যদিকে, মেরুদণ্ডে আঘাতের কারণে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা ভারী কাজ করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

রাব্বীর ভাষায়, ভবিষ্যতে কী করব, কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

তাঁদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র শুধু ভাতা দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখবে না; পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সহায়তার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেবে। কারণ তাঁদের মতে, চোখের আলো নিভে গেলেও বেঁচে থাকার লড়াই এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

এমআইকে/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর