Dhaka Mail Logo

জাতীয়

টিএসসিতে ছাত্রলীগের হামলায় আহত সেই লামিয়া এখন কেমন আছেন

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই বিকেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জড়ো হয়েছিলেন শত শত শিক্ষার্থী। তারা আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। হামলায় দিশেহারা হয়ে অনেকে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। এ সময় হামলার শিকার হন ইডেন কলেজের ছাত্রী লামিয়াসহ আরও এক ছাত্রী। পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা ছাত্রলীগের এক নেতার সামনে পড়েন। ওই নেতা তাদের ওপর হামলা করেন। পরে সেই হামলার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবির মেয়েটি ছিলেন ইডেন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী লামিয়া রায়হান। সেই লামিয়া এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন—তা জানতে তার সঙ্গে কথা বলেছে ঢাকা মেইল।

সোমবার রাতে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় লামিয়া রায়হানের। তিনি বলেন, এখনো তার ছাত্রত্ব শেষ হয়নি। পড়াশোনা ও টিউশনি করেই সময় কাটছে। তবে ওই ছবি তাকে অন্য রকম সম্মান এনে দিয়েছে। ঘটনার পরদিন থেকেই সহপাঠী, শিক্ষক ও সহযোদ্ধারা তাকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করেন। সবার মুখে ছিল তার প্রশংসা।

লামিয়া বলেন, যেহেতু তিনি সাধারণ শিক্ষার্থী এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই, তাই এখন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবেই জীবনযাপন করছেন। তখন দেশের প্রয়োজনে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। আন্দোলন শেষ হওয়ার পর তিনিও ঘরে ফিরে যান। এখন খুবই সাধারণ জীবনযাপন করছেন।

ইডেন কলেজের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এই ছাত্রী বলেন, পরদিন তার বিভাগের সবাই তার খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। তিনি কেমন আছেন, ওই সময় কী ঘটেছিল—এসব জানতে চান তারা।

হামলার পরও ভয়ভীতির মুখে পড়েননি

বিকেলে টিএসসিতে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হওয়ার পর রাতে কী ঘটেছিল, জানতে চাইলে লামিয়া বলেন, আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সেভাবে কোনো ভয়ভীতির সম্মুখীন হতে হয়নি। তিনি ইডেন কলেজের ক্যাম্পাস বা হলে থাকতেন না। যেদিন তার ছবি ভাইরাল হয়, সেদিন রাতে ইডেনের হলগুলোতে কলেজ ছাত্রলীগের নেত্রীরা গিয়ে তাকে খুঁজতে থাকেন। তিনি কোন বর্ষে পড়েন, কোথায় থাকেন—এসব জানতে চান তারা। তবে হলে না থাকায় তার পরিচয় তারা জানতে পারেননি।

এমনকি তার সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারেননি বা তাকে কোনো হুমকি-ধমকি দিতে পারেননি।

এই ঘটনার পর তার পরিবার বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তাকে আন্দোলনে যেতে বাধা দেওয়া হতো। লামিয়া বলেন, প্রথমে তার পরিবার খুব দুশ্চিন্তায় ছিল। তারা মনে করছিলেন, তিনি বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে বের হয়ে এসেছেন। তাকে বারবার বলা হতো, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনে না যেতে। কিন্তু পরে আন্দোলন আরও প্রকট আকার ধারণ করলে ৩০ জুলাই তিনি পরিবারকে বলেন, তাকে আন্দোলনে যেতেই হবে।

লামিয়া বলেন, তিনি তার মাকে বোঝান যে এখন আন্দোলনে যাওয়া প্রয়োজন। আন্দোলনের গুরুত্বও বোঝান। বলেন, আন্দোলনে গিয়ে সরকার পতন করতে হবে। না গেলে আরও বড় ক্ষতি হবে। এরপর পরিবার বিষয়টি সমর্থন করে। পরে তারাও তার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন।

ভাইরাল ছবি আন্দোলনে যেতে সাহস জুগিয়েছিল

ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর কী ধরনের সাড়া পেয়েছিলেন, জানতে চাইলে লামিয়া বলেন, তখন তার অনেক বন্ধু-বান্ধবী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর তারা তাকে বলেন, তারা হয়তো আন্দোলনে যেতেন না, কিন্তু তার ছবি দেখে আন্দোলনে যাওয়ার উৎসাহ পেয়েছেন। ছবিটি তাদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার সাহস জুগিয়েছিল বলেও তারা জানান।

ইডেনের গেট ভেঙে রাজপথে নামেন ছাত্রীরা

লামিয়া জানান, সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে বের হন। পরিকল্পনা ছিল ইডেন কলেজের ছাত্রীদের নিয়ে টিএসসিতে যাওয়ার। কিন্তু কলেজের সামনে গিয়ে দেখেন, প্রধান ফটক বন্ধ। বাইরে কয়েকজন ছাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, ছাত্রীরা আগে জড়ো হলেও কলেজ ছাত্রলীগের নেত্রীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। এরপর হলের ছাত্রীদের হলে ঢুকতে বাধ্য করা হয়। বাইরে থেকে আসা ছাত্রীদের বের করে দিয়ে প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এরপরের ঘটনা বর্ণনা করে লামিয়া বলেন, ওই পরিস্থিতিতে তারা সিদ্ধান্ত নেন, আন্দোলনে যাবেনই। তাদের এভাবে আটকে রাখা যাবে না। বাইরে থাকা ১০ থেকে ১২ জন মেয়ে মিলে বড় গেটটি ভেঙে ফেলেন। গেট ভাঙার পর আরও অনেক ছাত্রী তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এরপর তারা ইডেনের ছয়টি হলে যান। প্রতিটি হলের তালা ভেঙে ছাত্রীদের বের করে আনেন। সবাইকে একত্র করে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে টিএসসির উদ্দেশে রওনা হন।

টিএসসিতে সেদিন যা ঘটেছিল

সেদিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করে লামিয়া বলেন, তারা টিএসসিতে গিয়ে বসেছিলেন। স্লোগান চলছিল। বেলা আড়াইটার দিকে তারা খবর পান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগের লোকজন ঢুকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করছে। খবর পেয়ে সমন্বয়কেরা সিদ্ধান্ত নেন, টিএসসি থেকে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন। মিছিলের সামনে ছিলেন ছাত্রীরা, পেছনে ছাত্ররা।

লামিয়া বলেন, ক্যাম্পাসের মূল এলাকায় ঢোকার পর আবার ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন সমন্বয়কেরা সিদ্ধান্ত নেন, ক্যাম্পাসে না থেকে সবাই টিএসসিতে ফিরে যাবেন। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।

বাস থেকে বের করে মারধর

লামিয়া বলেন, মেয়েরা তখন খুব ভয় পেয়ে যান। অনেকেই ছত্রভঙ্গ হয়ে বাসার দিকে চলে যান। কেউ বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। তারা ভিসি চত্বরে গিয়ে দাঁড়ান। তখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বাস দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি ফুটপাতে বসে পড়েন।

প্রায় সাত-আট মিনিট পর তিনি দেখেন, ক্যাম্পাসের ভেতর থেকে ছাত্রলীগের বড় একটি দল রড, লাঠি, বাঁশসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে। তারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

লামিয়া বলেন, তিনি ভেবেছিলেন বাসের পেছন দিয়ে দৌড়ে পালাবেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বাসের পেছনে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী আটকা পড়ে যান। দুই দিক থেকে ছাত্রলীগ তাদের ঘিরে ফেলে। সামনে ছিল বাস, আর বাস লক্ষ্য করে ইট ছোড়া হচ্ছিল। বাসের কাচ ভেঙে যায়। এত ভিড় ছিল যে মাথা ঢাকারও সুযোগ পাননি। এরপর ছাত্রলীগ একে একে বাস থেকে আন্দোলনকারীদের বের করে মারধর করতে থাকে।

ছেলে-মেয়ে কেউই রক্ষা পাননি

লামিয়া বলেন, একপর্যায়ে আন্দোলনের এক শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের একজনকে অনুরোধ করেন, সেখানে অনেক মেয়ে আছেন, তাদের যেন না মারা হয়। তখন তিনি কয়েকজন মেয়েকে বের হয়ে যেতে বলেন। লামিয়া ও আরও পাঁচ-ছয়জন মেয়ে বাসের পেছন থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামেন।

তিনি বলেন, রাস্তায় নেমে কোথায় যাবেন, সেটাই বুঝতে পারছিলেন না। চারদিকে ছাত্রলীগের দখল। যাকে সামনে পাচ্ছিল, তাকেই মারছিল। ছেলে-মেয়ে কাউকেই ছাড়ছিল না। ভাইরাল ছবিতে তার পাশে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তাকে তিনি চিনতেন না। তারা দুজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিলেন না কোন দিকে যাবেন। তখন তিনি ওই মেয়ের হাত ধরে বলেন, চল, এদিকে দৌড় দিই।

তারা দৌড় শুরু করলে কয়েকবার তাদের ওপর হামলার চেষ্টা হয়। তারা শুধু প্রাণ বাঁচানোর জন্য দৌড়াচ্ছিলেন। সেই সময়ই একজন সাংবাদিক তাদের ছবি তুলে ফেলেন। তখন তারা বিষয়টি বুঝতেই পারেননি।

হামলা চললেও পুলিশ ছিল নীরব

লামিয়া বলেন, ছবিটি কখন তোলা হয়েছিল, তা তারা তখন জানতেন না। হামলার এলাকা থেকে বের হয়ে তারা গণতন্ত্র তোরণের সামনে যান। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। একই সঙ্গে দেখেন, তোরণের দুই পাশে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন পুলিশ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন না।

লামিয়া বলেন, বিষয়টি দেখে তার খুব রাগ হয়েছিল। তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ওদিকে শিক্ষার্থীদের মারধর করা হচ্ছে আর আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন? কিন্তু পুলিশ কোনো জবাব দেয়নি। পরে আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক তাদের বাসায় চলে যেতে বলেন। এরপর তিনি রিকশায় বাসায় ফেরেন।

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ফেসবুকে ঢুকে তিনি দেখেন, তাদের বিভাগের মেসেঞ্জার গ্রুপে আন্দোলনের বেশ কয়েকটি ছবি শেয়ার করা হয়েছে। সেখানে নিজের ছবিটি দেখে প্রথমে অবাক হয়ে যান। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই দেখেন, ছবিটি ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়ে গেছে।

এমআইকে/এআর