Dhaka Mail Logo

জাতীয়

টিনের ঢাল হাতে প্রতিরোধ গড়া নাসিরের স্বপ্ন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ

আব্দুল হাকিম

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

** ছররা গুলি টিনে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল বৃষ্টির ফোঁটা

** পাখির মতো মানুষ হত্যা দেখে রাজপথে নেমেছিলাম

** আজও কেউ জানতে চায়নি আমি বেঁচে আছি কি না

** প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী আমার খোঁজ নিয়েছিলেন

** কোনো কার্ড করেননি, কোনো সুবিধাও চাননি নাসির

** জুলাইয়ের স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি

রাজধানীর কারওয়ান বাজার। চারদিকে টিয়ারশেল, ছররা গুলি আর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভাঙা ইট, পোড়া টায়ার, লাঠি আর রক্তের দাগ। পুলিশের গুলির শব্দে আতঙ্কে ছুটছে মানুষ। এমন এক সময়ে হঠাৎই সবার নজর কাড়ে এক যুবক। কোনো অস্ত্র নয়, হাতে ছিল কেবল একটি টিনের পাত। সেই টিনকে ঢাল বানিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর দিকে। মুহূর্তটি ক্যামেরায় বন্দি হওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ছবিটি হয়ে ওঠে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত প্রতীক। আর টিনের ঢাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই যুবক মোহাম্মদ নাসির খান।

৪ আগস্ট ২০২৪। অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাপে তখন উত্তাল সারাদেশ। রাজধানী থেকে জেলা শহর, উপজেলা থেকে গ্রাম পর্যন্ত একটাই দাবি উচ্চারিত হচ্ছিল। দোকানপাট বন্ধ, সড়কে যানবাহন নেই বললেই চলে। বিকেলের দিকে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ হয়ে যায় ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ মেটার বিভিন্ন সেবা। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সেই সময়েও রাজপথ ছাড়েননি হাজারো মানুষ। তাদেরই একজন ছিলেন নাসির।

সেই দিনের স্মৃতি এখনও স্পষ্ট তার মনে। কীভাবে হাতে টিনের ঢাল এলো, সে প্রশ্নের জবাবে নাসির জানান, চারপাশে তখন মানুষ নিজেদের রক্ষা করার জন্য যা পাচ্ছিল, তাই দিয়ে ঢাল বানানোর চেষ্টা করছিল। কেউ প্লাস্টিকের ডিভাইডার, কেউ পানির ট্যাংকের ঢাকনা, আবার কেউ বিভিন্ন জিনিস ব্যবহার করছিল। তিনিও সেখান থেকে একটি টিনের পাত তুলে নেন। টিনটা হাতে নিয়ে আমি সামনে এগোতে শুরু করি। যখন ছররা গুলি টিনের ওপর এসে লাগছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন টিনের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। একটার পর একটা শব্দ হচ্ছিল। তারপরও আমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।

62b1f138-1843-4576-ad98-a7f668cf6937
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করছেন টিনের ঢাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই যুবক মোহাম্মদ নাসির খান। ছবি: সংগৃহীত

সেদিনের সেই ছবি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং মানুষের আলোচনায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে তাকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু নাসির জানান, তিনি কোনো প্রতীক হতে রাজপথে নামেননি। তিনি বলেন, শুরুতে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছিল। পরে যখন দেখলাম দেশের মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে, তখন আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। মনে হয়েছে, যদি আমি তখন আন্দোলনে অংশ না নিতাম, তাহলে সারা জীবন নিজের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকতাম।

নাসির বলেন, আন্দোলনে নামার আগে আমারও ভয় ছিল। কিন্তু রাজপথে এসে মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া আর নির্যাতনের দৃশ্য দেখার পর সেই ভয় আর কাজ করেনি। চোখের সামনে যখন মানুষকে গুলি করে মারা হচ্ছে, পিটিয়ে আহত করা হচ্ছে, তখন নিজের জীবনের হিসাব আর মাথায় থাকে না। তখন শুধু মনে হয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার।

রাজপথে নাসিরের হাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, ছিল না কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জামও। ছিল শুধু একটি টিনের পাত। কিন্তু সেটিকেই তিনি নিজের সাহসের প্রতীক বানিয়েছিলেন। পরে সেই টিনের ঢাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি জুলাই আন্দোলনের বহুল আলোচিত আলোকচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে। অনেকেই ভেবেছিলেন, এত আলোচিত হওয়ার পর হয়তো তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো বিশেষ স্বীকৃতি বা সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

নাসির জানান, তিনি কখনো জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী হিসেবে কোনো কার্ড করেননি। কোনো সুযোগ-সুবিধার জন্যও কোথাও আবেদন করেননি। তিনি বলেন, আমি কোনো ক্রেডিট নেওয়ার জন্য আন্দোলনে যাইনি। তাই কোনো কার্ডও করিনি। কোথাও যাইনি, কিছু চাইওনি। অনেক পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হয়েছে, অনেক টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে। কিন্তু এরপর কেউ জানতে চায়নি আমি বেঁচে আছি কি না, কেমন আছি।

কথাগুলো বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে আক্ষেপই বেশি ছিল। আলোচিত সেই ছবির পেছনের মানুষটিকে নয়, মানুষ মনে রেখেছে শুধু ছবিটিকেই। তিনি বলেন, যে ছেলেটা টিন নিয়ে এত অস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়েছিল, সে আজ বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, সেটাও কেউ জানতে চায়নি। আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং বিবেকের তাড়নায় অসংখ্য মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। তাদের অনেকেই আজও নীরবে নিজের জীবনে ফিরে গেছেন। কেউ কোনো স্বীকৃতি চাননি, দাবি করেননি কোনো বিশেষ মর্যাদাও।

জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে, বিচার পাবে এবং রাষ্ট্রে বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না।

9f4ad881-55fb-447a-a916-f2bddeb5af52
মুহূর্তটি ক্যামেরায় বন্দি হওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ছবিটি হয়ে ওঠে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত প্রতীক। আর টিনের ঢাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই যুবক মোহাম্মদ নাসির খান। ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই আলোচিত ছবির পর নাসিরের জীবন খুব একটা বদলে যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি ছড়িয়ে পড়লেও তিনি ফিরে যান নিজের স্বাভাবিক জীবনে। তবে সম্প্রতি তার জীবনে আসে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাকে সচিবালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, নিজের ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন তিনি। সেই সাক্ষাতের স্মৃতি এখনও আবেগ নিয়ে স্মরণ করেন নাসির।

তিনি বলেন, সচিবালয়ে প্রবেশের পর প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে ঢুকতেই তার সঙ্গে আন্তরিকভাবে কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। দরজা দিয়ে ঢোকার পরই উনি আমাকে বললেন, নাসির, কী খবর তোমার?’ কথাটা শুনে আমার খুব ভালো লেগেছিল। মনে হয়েছে, উনি আমাকে অনেক আগে থেকেই চেনেন। এরপর আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিলেন। আন্দোলনের সময় কী হয়েছিল, এখন কী করছি, সবকিছু জানতে চাইলেন। পরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় কথা হয়।

নাসির জানান, সাক্ষাৎকালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জুলাই আন্দোলনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। রাজপথে কীভাবে সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখে নেমেছিলেন, কীভাবে অসংখ্য মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন, সেই কথাগুলোও তিনি বলেন। একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশ নিয়ে তরুণদের প্রত্যাশার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

নাসির বলেন, আমি বলেছি, যারা আন্দোলনে নেমেছিল তারা কোনো ব্যক্তিগত লাভের জন্য নামেনি। তারা চেয়েছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে সাধারণ মানুষের কথা শোনা হবে। আমরা চাই সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক। জুলাই আন্দোলনের সময় নিজের মৃত্যুর ভয়কে জয় করেই রাজপথে দাঁড়াতে হয়েছিল। কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মানুষ যখন চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছিল, তখন নিজের জীবনের হিসাব করার সময় ছিল না। তখন মনে হয়েছে, যদি আজ চুপ করে থাকি, তাহলে সারাজীবন নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে থাকব।

নাসির আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহিণী, সবাই যে যার অবস্থান থেকে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণেই আন্দোলনটি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। মানুষ যখন একসঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন কোনো শক্তিই তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না। জুলাই আন্দোলন সেটাই প্রমাণ করেছে।

ভবিষ্যতে যদি আবারও এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার হুমকির মুখে পড়বে, তাহলে আবারও রাজপথে নামবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নাসির স্পষ্টভাবে বলেন, প্রয়োজন হলে তিনি আবারও আন্দোলনে অংশ নেবেন। তিনি বলেন, যদি আবার এমন সময় আসে, যখন মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে না, গুম হবে, খুন হবে, মিথ্যা মামলার শিকার হবে, তাহলে অবশ্যই রাজপথে নামব। শুধু আমি না, আমি বিশ্বাস করি তখন দেশের মানুষও আবার নেমে আসবে।

নাসির বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে। যেখানে ভালোকে ভালো এবং খারাপকে খারাপ বলা যাবে। সমালোচনা করলেই কেউ শত্রু হয়ে যাবে না। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমতা নিশ্চিত করতে হবে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বলতে আমি সবকিছু বুঝি। বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সব জায়গায় সমান অধিকার থাকতে হবে। আমরা দুর্নীতিমুক্ত একটি বাংলাদেশ চাই। যেখানে সাধারণ মানুষের মর্যাদা থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের মূল্যায়ন শুধু কোনো কার্ড বা স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই হতে পারে। সরকার আমাদের কথা মূল্যায়ন করবে, সাধারণ মানুষের কথা শুনবে, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেবে, সেটাই আমরা চাই।

এএইচ/এমআই