মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
*বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ উত্তাল সারা দেশ
*শুরু থেকে সক্রিয় ছিল জামায়ত-শিবির, এক পর্যায়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা
*প্রকাশ্যেই মাঠে ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
*বিক্ষোভ ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ছিল বাম দলগুলোর
*প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল এবি পার্টি, গণঅধিকার, নাগরিক ঐক্যের
*শুরুতে বক্তব্য বিবৃতি, চূড়ান্ত পর্যায়ে মাঠে নামে অন্যান্য ইসলামী দল
জুলাই-আগস্ট ২০২৪। কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি খুব অল্প সময়েই রূপ নেয় ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণঅভ্যুত্থানে। একের পর এক প্রাণহানি, দমন-পীড়ন, কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়।
রাজপথে নেতৃত্বে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আন্দোলন যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে শুরু করে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
আন্দোলনের শুরুতে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকলেও ১৬ জুলাই থেকে সংঘাত ও প্রাণহানি বাড়ার পর তাদের অবস্থানে পরিবর্তন আসে। একের পর এক বিবৃতি, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, শোক মিছিল এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তারা ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করে। কোথাও তারা সরাসরি রাজপথে নেমেছে, কোথাও আইনি ও রাজনৈতিক সহায়তা দিয়েছে, আবার কোথাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত গঠনের চেষ্টা করেছে। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মী গ্রেফতার, আহত ও মামলার মুখোমুখিও হন বলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর দাবি।
তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের হাতে, আর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলনের বিস্তার, জনমত সৃষ্টি এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক চাপ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। দলভেদে সেই ভূমিকার ধরন ও মাত্রা ছিল ভিন্ন। কেউ রাজপথে সক্রিয় ছিল, কেউ রাজনৈতিক সমর্থন ও সাংগঠনিক সহযোগিতা দিয়েছে, আবার কেউ আন্দোলনের আন্তর্জাতিকীকরণে কাজ করেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ, কর্মসূচি এবং দলগুলোর দাবি-দাওয়ার আলোকে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাম রাজনৈতিক দল, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য এবং অন্যান্য ইসলামপন্থি দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ উত্তাল সারা দেশ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এ সময় ছাত্র-জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাজপথে কর্মসূচি, রাজনৈতিক সমর্থন এবং সাংগঠনিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে দলটির নেতারা দাবি করেন। আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বিএনপি। আন্দোলনে প্রাণহানি বাড়তে থাকলে দলটি ধারাবাহিকভাবে বিবৃতি, প্রতিবাদ, শোক মিছিল, বিক্ষোভ, কালো ব্যাজ ধারণ এবং মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করে। কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলেন। দলটির দাবি, আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তাদের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন এবং অনেকে প্রাণও হারিয়েছেন।
দলটির নেতারা বলেন, জুলাই আন্দোলন কেবল সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার দাবিতে একটি ঐতিহাসিক গণজাগরণ। সে কারণে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলনের সময় সরকারের কঠোর অবস্থান, গণগ্রেফতার এবং সহিংসতার অভিযোগের মধ্যেও বিএনপি রাজপথে কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। দলটির নেতাদের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় নির্দেশনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেতাকর্মীরা ছাত্র-জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দাবি তোলে। একই সঙ্গে গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানায়।
দলটির মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ একটি জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। সেই প্রত্যাশা পূরণে জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরই হবে আন্দোলনের প্রকৃত সফলতা।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দাবি, জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক সমর্থনও আন্দোলনকে দেশব্যাপী বিস্তৃত করতে সহায়তা করেছে। তাদের মতে, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ গণঅভ্যুত্থানকে আরও বেগবান করেছে এবং রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের দাবিকে শক্তিশালী করেছে।
দলটির নেতারা আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এই আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাই বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান এক বক্তৃতায় বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনকে যারা শুধু ছাত্রদের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে চান, তারা নিজস্ব ইচ্ছায় করতে পারেন, তবে সেটা সঠিক বিশ্লেষণ না। ৩৬ জুলাইয়ে জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ছাত্ররা জুলাই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন। কিন্তু তারেক রহমান ১০ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।’
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এটিএম আব্দুল বারী ড্যানী বলেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১৬ বছর ধরে ফ্যাসিস্টবিরোধী সফল আন্দোলনের ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়েছে। এ আন্দোলনের ফলে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন হয়েছে এবং দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। দেশের মানুষ মুক্তি পেয়েছে। এই সফল আন্দোলনের মূল নায়ক তারেক রহমান।
শুরু থেকে সক্রিয় ছিল জামায়াত-শিবির, এক পর্যায়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা
আন্দোলনের শুরুর দিকে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সমর্থন জানায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আন্দোলনের শুরু থেকে দলটির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতকর্মীরা নেতৃত্ব ও পরিচালনায় অংশ নেয়। জামায়াতের পক্ষ থেকেও সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয় ১৮ জুলাই।
দলটির পক্ষ থেকে ধারাবাহিক বিবৃতিতে ছাত্রদের ওপর বলপ্রয়োগ, গুলি ও প্রাণহানির নিন্দা জানিয়ে সহিংসতা বন্ধ এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানানো হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন।
দলটির দাবি, বহু নেতাকর্মী ছাত্র-জনতার সঙ্গে রাজপথে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ, মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। জামায়াত নেতাদের ভাষ্য, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অনেক কর্মী মাঠে ছিলেন। আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে অনেকেই আহত হন এবং বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতারও হন।
জামায়াত নেতাদের দাবি, আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দলটির অসংখ্য নেতাকর্মী গ্রেফতার হন। অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাদের নেতাকর্মীদের একটি অংশকে কারাভোগও করতে হয়েছে।
আন্দোলনের সময় জামায়াত দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া, চিকিৎসা সহায়তা এবং মানবিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেয় বলেও দলটির নেতারা দাবি করেন। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর রাখেন এবং নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।
আন্দোলন তীব্র হওয়ার এক পর্যায়ে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, এর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
জামায়াতের নেতারা দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দলটির নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্ততা উপলব্ধি করেই তৎকালীন সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তাদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা জারি করেও আন্দোলনে জামায়াতের অংশগ্রহণ ঠেকানো যায়নি; বরং দলটির নেতাকর্মীরা ছাত্র-জনতার সঙ্গে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত থেকে আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেন।
দলটির মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সে কারণে সরকার পতনের পরও জামায়াত রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে।
আরও পড়ুন: প্রকল্পের ২৩ শতাংশই অনিয়ম!
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াত গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে। দলটির নেতারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন; শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, আন্দোলনে জামায়াতের বহু নেতাকর্মী শহীদ, আহত ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, এই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং সব শহীদ ও আহতের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দলটি আরও দাবি করে, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী শক্তির অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে।
দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘এটার পেছনে যে আমরা ছিলাম এটা গোয়েন্দারা জানতো, সরকার জানতো। এজন্যই তো আমাদেরকে ব্যান করে দিয়েছে, শিবিরকে ব্যান করেছে। আর কোনো দলকে তো করে নাই। এটা যে জামায়াত-শিবিরের একটা আন্দোলন এটা যেন প্রকাশিত না হয়, আমরা চেয়েছি এটা একটা সর্বজনীন রূপ দেওয়ার জন্য।’
প্রকাশ্যেই মাঠে ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুরু থেকেই ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে। দলটির নেতারা দাবি করেন, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের নেতাকর্মী ও সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা রাজপথে থেকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেন এবং আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলা, গুলি ও প্রাণহানির ঘটনা শুরু হওয়ার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একাধিক বিবৃতিতে বলপ্রয়োগের নিন্দা জানায় এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। একই সঙ্গে দলটি দমন-পীড়ন বন্ধ, গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি এবং নিহতদের বিচার দাবি করে। আন্দোলন বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলটির সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ এবং ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। জুলাই মাসে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে তারা। দলটির দাবি, এসব কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে অনেক নেতাকর্মী হামলা, গ্রেফতার ও হয়রানির শিকার হন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) আন্দোলনের সময় একাধিক বক্তব্যে বলেন, জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবিকে শক্তি দিয়ে দমন করা কোনো সমাধান হতে পারে না। তিনি রাজনৈতিক সংলাপ, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। দলটির নেতারা দাবি করেন, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের নেতাকর্মীরা আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং মানবিক সহযোগিতার কাজেও সম্পৃক্ত ছিলেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন মসজিদ ও সামাজিক পরিসরে আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতেও তারা কাজ করেন বলে দলটির বক্তব্য।
বিক্ষোভ ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ছিল বাম দলগুলোর
সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চারের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিল প্রগতিশীল বাম দলগুলো। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সঙ্গে জোটবদ্ধ দলগুলো ছাড়া বাকিরা সক্ষমতা অনুযায়ী সমালোচনা করে জনগণকে জাগানোর চেষ্টা করতেন। ’২৪- এর জুলাইয়ের শুরুতে কোটা আন্দোলনসহ সরকারের দুর্নীতি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয় বাম দলগুলো। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিল কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ, গণসংহতি আন্দোলন ইত্যাদি।
১৬ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সামনে কর্মসূচি ঘোষণা করে সিপিবি। তবে আবু সাঈদের মৃত্যুর খবরে ফুঁসে ওঠা ক্ষোভে দুদকের সামনের কর্মসূচি বাদ দিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ মিছিল করেন তারা। ১৮ জুলাই শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও আন্দোলনে সরব দেখা যায় বাম দলকে। ১৯ জুলাই প্রেসক্লাবের সামনে গণতন্ত্র মঞ্চের ব্যানারে মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেয় সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলনসহ অন্যান্য দল। আন্দোলনে সব হত্যার দায় সরকারকে নিতে হবে এই দাবি নিয়ে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে থেকে পল্টনের দিকে যেতে চায়। কিছুদূর যাওয়ার পরই বাধা দেয় পুলিশ।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ধারাবাহিকভাবে স্বৈরতন্ত্রবিরোধী লড়াইয়ে আমরা বরাবরই সামনের কাতারে ছিলাম। আন্দোলনে আমরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করেছি। আমার জানামতে ১৬ জুলাই ছিল রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মের প্রথম বিক্ষোভ। এছাড়া জুলাই বিপ্লবে সিপিবির ৪ কর্মী প্রাণ হারান। আর শতাধিক আহতের তালিকা এখনও আমাদের কাছে আছে।’
এভাবেই ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত আন্দোলনে যোগ দেয় বাম দলগুলো। সারা দেশ থেকে খবর আসে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। আহতরা কাতরাচ্ছে হাসপাতালে। ২৬ জুলাই নিহতদের স্মরণ ও বিচার চেয়ে মিছিল করে প্রগতিশীল দলগুলো। জুলাইয়ের দিন যত গড়ায় আন্দোলনের দানাবাধা ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো।
৩০ জুলাই জিপিওর সামনে সিপিবির সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদী গানের মিছিলে সবাইকে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। পুরো জিপিও এবং আশপাশের রাস্তা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের প্রতিবাদী গানের মঞ্চ হয়ে ওঠে। ১ আগস্ট সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট শাহবাগে মানবন্ধন ও সমাবেশ করে।
শুরুতে বক্তব্য বিবৃতি, চূড়ান্ত পর্যায়ে মাঠে নামে অন্যান্য ইসলামী দল
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও কয়েকটি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলও বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত ছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গুলি ও প্রাণহানির ঘটনার পর এসব দল ধারাবাহিকভাবে বিবৃতি দেয়, প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে এবং সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানায়। যদিও এসব দলের সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি বড় দলগুলোর তুলনায় সীমিত ছিল, তবুও তারা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা চালায়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। দলটির শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন বিবৃতিতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ও দমন-পীড়নের নিন্দা জানান এবং সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। রাজধানীসহ কয়েকটি জেলায় দলটির উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়। দলটি নিহতদের বিচার, গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের দাবি তোলে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশও একাধিক বিবৃতিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করে। দলটির নেতারা বলেন, জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবিকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে দলটির নেতারা প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন এবং রাজনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে। দলটি গুলি, গ্রেফতার ও প্রাণহানির ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের বিচারের দাবি তোলে। একই সঙ্গে তারা আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জনগণের মতামতের প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানায়।
নেজামে ইসলাম পার্টি আন্দোলনের সময় বিবৃতি দিয়ে ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায় এবং সরকারকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়। দলটি দেশের বিভিন্ন স্থানে সীমিত পরিসরে প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করে।
আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ইসলামপন্থি দলের ছাত্র ও যুবসংগঠনের কর্মীরাও নিজ নিজ এলাকায় শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করেন। কোথাও কোথাও তারা বিক্ষোভ, দোয়া মাহফিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করেন। দলগুলোর দাবি, তাদের কিছু নেতাকর্মীও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি, গ্রেফতার ও হয়রানির শিকার হন।
প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল এবি পার্টি, গণঅধিকার, নাগরিক ঐক্যের
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি কয়েকটি অপেক্ষাকৃত নতুন ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ এবং নাগরিক ঐক্য আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায় এবং বিভিন্ন পর্যায়ে রাজপথের কর্মসূচি, বিবৃতি, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেয়।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত দাবি হিসেবে উল্লেখ করে। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং সদস্যসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ একাধিক বিবৃতিতে আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগের নিন্দা জানান এবং গ্রেফতার ও গুলির ঘটনার প্রতিবাদ করেন। আন্দোলন তীব্র হওয়ার পর এবি পার্টির নেতাকর্মীরা রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে গ্রেফতার করা হয় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুকে।
নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই সরাসরি মাঠে সক্রিয় ছিল। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করেন এবং রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধনে অংশ নেন।
গণঅধিকার পরিষদের দাবি, আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তাদের বহু নেতাকর্মী আহত ও গ্রেফতারের শিকার হন। দলটি ধারাবাহিকভাবে বিবৃতি দিয়ে দমন-পীড়নের নিন্দা জানায় এবং সরকারকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানায়। দলটির সভাপতি নুরুল হক নুরকেও এক পর্যায়ে গ্রেফতার করে ফ্যাসিবাদি সরকার।
এছাড়াও মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যও আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। দলটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে এবং আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকারের পদত্যাগের দাবি তোলে।
নাগরিক ঐক্যের নেতারা বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলন, আলোচনা সভা ও সমাবেশে আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তাদের মতে, জুলাই আন্দোলন ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
টিএই/এআরএম