বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

জুলাইয়ের ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’

৬ রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, চলতি মাসে আরও তিন মামলার অপেক্ষা

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

শেয়ার করুন:

৬ রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, চলতি মাসে আরও তিন মামলার অপেক্ষা
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে বড় মাইলফলক অতিক্রম করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর আগস্ট মাস থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করে ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে। এসব রায়ে মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও তিনটি মামলা চলতি মাসেই রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।

এ পর্যন্ত ঘোষিত ৬টি রায়

১. শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের মৃত্যুদণ্ড: ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ঘোষিত প্রথম রায়ে ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এ মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

২. চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৩. আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলা: ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ মামলায় ভ্যানে করে লাশ পোড়ানোর লোমহর্ষক অভিযোগ প্রমাণিত হয়।

৪. আবু সাঈদ হত্যা মামলা: ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল রংপুরের আবু সাঈদ হত্যার দায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। এছাড়া রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদসহ ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

৫. রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি: গত ২৮ জুন ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান (দ্বিতীয়বার মৃত্যুদণ্ড), সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম এবং ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

৬. হাসানুল হক ইনুর কারাদণ্ড: ৩০ জুন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি ও কুষ্টিয়ায় হত্যার ঘটনায় তাকে এই সাজা দেওয়া হয়।

জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দুইটি ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে। আমাদের ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির ২৩ জন কর্মকর্তা এবং প্রসিকিউশন টিমের ২০ জন কর্মকর্তা কাজ করছি। এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে যে ছয়টা মামলার বিচারকার্য শেষ করতে পেরেছি, এটি অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি জানান, শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারীদের মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য তদন্ত ও বিচার উভয়ই আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করা।

চলতি মাসে আরও প্রায় তিনটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে বলে জানান আমিনুল ইসলাম। বর্তমানে ওবায়দুল কাদেরের মামলার যুক্তিতর্কের শুনানি চলছে এবং মাহবুব উল আলম হানিফের মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ায় রায় যে কোনো দিন হতে পারে। এছাড়া যাত্রাবাড়ীর তাইম ভূঁইয়া হত্যাকাণ্ডের যুক্তিতর্ক ও জিয়াউল আহসানের মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ ও প্রত্যাবর্তন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আইনের সেকশন ২১-এর ২ ও ৩ উপ-ধারায় ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে। ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আর কোনো আপিল দায়ের করা যাবে না। যেহেতু তিনি পলাতক ছিলেন এবং ৩০ দিন পার হয়ে গেছে, তাই আইন অনুযায়ী তার আপিলের সুযোগ নাই বলে আমার অভিমত। তবে বিষয়টি অ্যাপেলেট কোর্ট (আপিল বিভাগ) দেখবে।

তাকে ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার তাকে আনার চেষ্টা করছে। উনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, উনাকে পাওয়া গেলে রায় কার্যকর হবে। উনি যদি আপিল করার সুযোগ পান, তবে আপিল নিষ্পত্তির সাপেক্ষে হবে। তবে আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কেউ জামিন পেয়েছেন এমন নজির নেই।

পলাতক আসামিদের রায় ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত

পলাতক আসামিদের রায় কার্যকর নিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, আইনের বিধান অনুযায়ী পলাতক ব্যক্তির বিচার চলছে। রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে যতক্ষণ না পর্যন্ত গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণ করছেন, ততক্ষণ সুযোগ নেই। তবে আমরা অর্থনৈতিক জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া কিছুদিনের মধ্যে শুরু করব।

c9321f64-6833-4caa-8fb2-5cde103c711a

ট্রাইব্যুনাল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দণ্ডিতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এ যাবতকাল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রি করে শহীদ পরিবারের মধ্যে বিতরণের কোনো নজির নেই। আমরা আইনকানুন পর্যালোচনা করছি এবং দ্রুতই এ বিষয়ে ফলাফল দেখতে পারবেন।

তদন্তের নতুন কৌশল: ‘জোনাল কনসোলিডেশন’

মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে 'সমন্বিত তদন্ত কৌশল' নেওয়া হয়েছে। ৫ ৯০টি অভিযোগের মধ্যে ১০৯টি বাছাই করা হয়েছে। 

আমিনুল ইসলাম বলেন, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা বা নরসিংদীর পুরো ঘটনাকে আলাদা আলাদা তদন্ত না করে যদি একটি তদন্তের আওতায় আনা যায়, তবে সময় ও শ্রমের সাশ্রয় হবে এবং বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোর আকাঙ্ক্ষা দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হবে।

জুলাইয়ের বিচারের পাশাপাশি গুম ও ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো নিয়েও কাজ চলছে। সারাদেশে প্রায় ৩,০০০ এরও অধিক ক্রসফায়ারের ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২টি মামলার রিপোর্ট পাওয়া গেছে এবং পর্যায়ক্রমে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হচ্ছে। কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরাম হত্যা ও শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচারকার্যও শুরু হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ যাদের সাজা কম হয়েছে, তাদের সাজা বাড়াতে  রাষ্ট্রপক্ষের আপিল নিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, যাদের সাজা অল্প ছিল, তাদের আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় সাজা ভোগ করে তারা বের হয়ে যাবে। আমরা খুব দ্রুত এই আপিলগুলো শুনানির উদ্যোগ নিব।

আমিনুল ইসলাম সবশেষে বলেন, মানুষের প্রত্যাশা জুলাইয়ের বিচার দ্রুত পাওয়া। আমরা সেই আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাজ করে চলেছি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট’ করা হয়। ২০০৯ সালে এতে কিছু সংশোধনী এনে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু হয়।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনালকেই বেছে নেয়।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের পথ প্রশস্ত করতে আইনে আরও এক দফা সংশোধনী আনা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় এসেছে।

আরএনবি/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর