আব্দুল হাকিম
৩০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম
# সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি প্রকল্প
# পরীক্ষা ছাড়াই ৪৬ কোটি টাকা পরিশোধ
# অডিটে মিলল একের পর এক অনিয়ম
# অগ্রিম অর্থ পেয়েও কাজে ধীরগতি
# ৪২ উপজেলায় চলছে প্রকল্পের কাজ
# কাজের চেয়ে অনিয়মেই বেশি আলোচনা
# ভেরিয়েশন ছাড়াই ২০৪ কোটি টাকার ব্যয়
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জাতীয় গ্রিড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয়েছিল ‘ঢাকা এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড সঞ্চালন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ’ প্রকল্প। তবে বাস্তবায়নের মাঝপথে এসে প্রকল্পটি এখন ধীরগতির, একের পর এক আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অমীমাংসিত অডিট আপত্তির কারণে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন, ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৬১ দশমিক ২৫ শতাংশ। অথচ প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে বর্তমান অগ্রগতির ভিত্তিতে বর্ধিত সময়েও প্রকল্পটি শেষ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
প্রকল্পটি দেশের পাঁচটি বিভাগ, ২১টি জেলা এবং ৪২টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হবে। এর আওতায় ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, ভোলা, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, নওগাঁ, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার বিভিন্ন এলাকায় কাজ বাস্তবায়ন হবে।
এসব জেলার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ভাঙ্গা, মাদারীপুর সদর, শিবচর, রাজৈর, কালীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, মোকসেদপুর, পিরোজপুর সদর, ভান্ডারিয়া, ভোলা সদর, ঝালকাঠি সদর, রাজাপুর, মির্জাগঞ্জ, বাগেরহাট সদর, ফকিরহাট, কচুয়াসহ মোট ৪২টি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আইএমইডি বলছে, মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৫৫ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে প্রকল্পটির বিরুদ্ধে পাঁচ অর্থবছরে ২৫টি অডিট আপত্তিতে মোট ২ হাজার ৫৩৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ১৩টি আপত্তিতে ২ হাজার ৪৩২ কোটি ৪২ লাখ টাকার বিষয় নিষ্পত্তি করা হলেও বাকি ১২টি আপত্তিতে ১০৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার অনিয়ম এখনও অনিষ্পন্ন রয়েছে।
আইএমইডির তথ্যমতে, অনিষ্পন্ন আপত্তিগুলোর মধ্যে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, অনুমোদন ছাড়া ব্যয়, ঠিকাদারকে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা প্রদান, ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম, চুক্তি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অগ্রিম দেওয়া প্রায় ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকার চূড়ান্ত সমন্বয়ের প্রমাণপত্র জমা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বিমা সুরক্ষা নিশ্চিত না করায় সরকারি রাজস্ব ক্ষতির বিষয়ও অডিটে উঠে আসে। এসব বিষয়ে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
২০২১-২২ অর্থবছরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে অনিয়মিত প্রাক্কলনের ভিত্তিতে প্রায় এক কোটি ৩৩ লাখ টাকা উত্তোলনের বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়। নিরীক্ষকরা বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় নির্ধারণ ও অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হয়নি।
সবচেয়ে বড় অনিয়ম ধরা পড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরের নিরীক্ষায়। সেখানে ভেরিয়েশন আদেশ ছাড়াই প্রায় ২০৪ কোটি ২৬ লাখ টাকার ব্যয়, ভূমি অধিগ্রহণের আনুষঙ্গিক খাতে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকার অনিয়মিত পরিশোধ এবং জেলা প্রশাসকের কাছে প্রায় ৫৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা প্রদান করলেও প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি উপস্থাপন না করার বিষয়টি উঠে আসে। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) বাইরে ব্যয় এবং অনুমোদনহীন আর্থিক দায় গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের বাইরে ভূমি উন্নয়ন ব্যয় এবং বিলম্বকারী ঠিকাদারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় না করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অডিটের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনা চুক্তি ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দুর্বলতার প্রমাণ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বাধিক সাতটি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে বাধ্যতামূলক কারখানা গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা ছাড়াই প্রায় ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা পরিশোধ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়া ট্রান্সফরমারের তেল আমদানি, নিবন্ধন ও অনুমোদন ছাড়া ড্রোন ক্রয়, চুক্তির পরিমাণের অতিরিক্ত মালামাল আমদানি এবং অগ্রিম অর্থ দেওয়ার পরও গ্যাস নিরোধক উপকেন্দ্র নির্মাণে ধীরগতির বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।
আইএমইডি প্রকল্প বাস্তবায়নে চারটি বড় ঝুঁকিও চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার অস্থিতিশীল থাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৈশ্বিক সংকট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় বিরোধ ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবে আন্তর্জাতিক দরপত্র মূল্যায়ন, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও জনবল ব্যবস্থাপনাতেও বিলম্ব হয়।
প্রকল্পটি বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও পশ্চিমাঞ্চলে দুটি ৪০০ কেভি সাবস্টেশন, একটি ২৩০ কেভি সাবস্টেশন এবং ৪০০, ২৩০ ও ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ৪০টিরও বেশি উপজেলায় প্রকল্পের কাজ চলছে।
প্রকল্পে ওঠা অনিয়ম ও অডিট আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ ফয়জুল কবির এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে প্রকল্পের ধীরগতি কাটিয়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে আইএমইডি। সংস্থাটি বলেছে, নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ করে অবশিষ্ট কাজ শেষ, ড্রোন পরিচালনায় পাওয়ার গ্রিডের নিজস্ব জনবলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্পৃক্ত করা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে লিকুইডেটেড ড্যামেজ (ক্ষতিপূরণ) আরোপ, নিয়মিত দাফতরিক তদারকি জোরদার এবং প্রকল্পের তথ্য নিয়মিত প্রকল্প ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থায় (পিএমআইএস) হালনাগাদ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদারকি এবং অমীমাংসিত অডিট আপত্তি শুধু সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের প্রশ্নই তোলে না, বরং ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তিগুলোর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ব্যয় বৃদ্ধি, সময় বৃদ্ধি এবং আর্থিক অনিয়ম একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। শুধু সাধারণ তদন্ত নয়, প্রতিটি বড় প্রকল্পে বিশেষায়িত তদন্তমূলক নিরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের কাছ থেকে রাষ্ট্রের ক্ষতি আদায় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এএইচ/জেবি