Dhaka Mail Logo

জাতীয়

জমি জটিলতায় ঝুলছে উন্নয়ন, কৌশল বদলাচ্ছে রেলওয়ে

মোস্তাফিজুর রহমান

২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৩০ পিএম

# ভূমি অধিগ্রহণে পৃথক প্রকল্পের পরিকল্পনা 
# মূল প্রকল্পে গতি আনতে নতুন উদ্যোগ 
# নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য 
# বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর প্রত্যাশা

‎প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। অনেক ক্ষেত্রে জমি জটিলতায় শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ছে প্রকল্প বাস্তবায়ন। এতে প্রকল্পের সুফল পেতে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়তি অর্থের অপচয়ও হচ্ছে। ফলে জমিসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে কৌশল বদলাচ্ছে রেলওয়ে।

কর্মকর্তা বলছেন, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া আগেই সম্পন্ন করতে পৃথক প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এতে মূল প্রকল্পের কাজ শুরু করতে জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের পথও সুগম হবে। যারফলে বাড়তি অর্থ অপচয় রোধ করাও সম্ভব হবে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে কিছু বড় প্রকল্পের আগে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে পৃথক প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও সহজ করতে কুমিল্লা থেকে ঢাকা পর্যন্ত যে কর্ডলাইন নির্মাণ হচ্ছে, সেখানে ল্যান্ড রিকুইজিশন বা ভূমি অধিগ্রহণের জন্য একটি পৃথক প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, শুধু এই কর্ডলাইনই নয়, নতুন করে যেসব রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা হচ্ছে সেগুলোর ক্ষেত্রেও ভূমি অধিগ্রহণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া আগেই সম্পন্ন করতে পৃথক প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘কোনো প্রজেক্ট নিলে কয়েক বছর লেগে যায় শুধু ল্যান্ড রিকুইজিশন নিয়েই। এতে কাজ শেষ হতে বেশ সময় লেগে যায়। এ কারণে আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর আগেই ল্যান্ড রিকুইজিশনের পৃথক প্রকল্প নিয়ে কাজ এগিয়ে রাখছি।’

ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে যত জটিলতা

জানা যায়, ‎কয়েক বছর আগে নীলফামারীর চিলাহাটি রেল স্টেশনসংলগ্ন তিনটি নতুন লুফ লাইন স্থাপন, নতুন অত্যাধুনিক প্ল্যাটফর্ম ও ওয়াসফিট স্থাপনের কাজ নিয়েছিল রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল। এজন্য ২.৮৪ একর জমি অধিগ্রহণের তালিকা তৈরি করা হয়। কিন্তু জমির মালিকদের বাধার মুখে আটকে যায় সেই কাজ। পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের দেড় বছরের বেশি প্রচেষ্টায় অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসন হয়।

বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত ৮৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ‎এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৯৬০ একর (বগুড়ায় ৪৭৯ একর ও সিরাজগঞ্জে ৪২০ একর) জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের। কিন্তু জমির ন্যায্যমূল্য নিয়ে সোচ্চার ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকেরা। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার মুখে পড়ছে কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেলসংযোগ স্থাপন হয় দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম ১২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে। ‎কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়নেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় পড়ে রেলওয়ে। এমনকি, প্রকল্পটির অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হলেও বিভিন্ন জায়গায় ভূমি অধিগ্রহণ থেকে গিয়েছিল।

২০১৮ সালের ফরিদপুরের মধুখালী থেকে মাগুরা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প নেয় রেলওয়ে। প্রকল্পটি ২০২২ সালের এপ্রিলের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলে এখনোও চলমান। যার প্রধান কারণ জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলপথ নির্মাণে প্রায় প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন থেমে যাচ্ছে জমি অধিগ্রহণ জটিলতায়। ফলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে যেমন দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিচ্ছে, তেমনি বাড়তি অর্থের অপচয়ও ঘটছে।

নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি জটিলতার শঙ্কা

রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, আগামীতে বেশ কিছু বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এরমধ্যে দেশের রেল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা ১৬টি জেলায় রেল সংযোগ ঘটবে। নিজস্ব জমি না থাকা এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী ও পায়রা বন্দর হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেল সংযোগ প্রকল্পের জন্য ২০৫ কিলোমিটারের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মাণে ৫ হাজার ৬৩৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

মাগুরা থেকে ঝিনাইদহ হয়ে পোড়াদহ ও দর্শনাসহ একটি রেল নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই রেলপথ নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

নোয়াখালী চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর রেলপথ এবং ময়মনসিংহ থেকে শেরপুর হয়ে নাকুগাঁও স্থলবন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নেও জমির প্রয়োজন হবে।

এছাড়াও নতুন স্টেশন নির্মাণ, বিদ্যমান রেলপথ সম্প্রসারণসহ রেলওয়ের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পেও অনেক জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। ফলে এসব জমি অধিগ্রহণ নিয়ে নানা জটিলতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণেই নতুন প্রকল্প শুরুর আগেই ভূমি অধিগ্রহণ ও আনুষঙ্গিক কাজ পৃথক প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘‎ভূমি অধিগ্রহণে পৃথক প্রকল্প নেওয়া হলে নানা জটিলতা যেমন এড়ানো যাবে, তেমনি অর্থের অপচয় রোধ করাও সম্ভব হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।’

অপচয় রোধের ব্যাখ্যা করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ধরুন, একটা প্রকল্প বাস্তবায়নে এডিবির কাছ থেকে ঋণ নিলাম। ঋণ নিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করে দেখা গেল দুই চার বছর চলে যাচ্ছে ল্যান্ড রিকুইজিশনেই, তখন একটা কমিটমেন্ট চার্জ দিতে হয়। সেটা সরকারের জন্য জন্য লস। এখন পৃথক প্রকল্প নিলে মূল প্রকল্প বাস্তবায়নে এই অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।’

এএম/জেবি