দেশজুড়ে একের পর এক নতুন রেলপথ চালু হলেও যাত্রীসেবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কোচ বা বগির তীব্র সংকট। পর্যাপ্ত বগি না থাকায় অনেক রুটে চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনা করা যাচ্ছে না, আবার চলমান অধিকাংশ ট্রেনই চলছে পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ কোচ নিয়ে। ফলে যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই সংকট কাটাতে দেড় হাজারের বেশি নতুন কোচ সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে চলতি মাসেই ভারত থেকে আসছে প্রথম চালানের আধুনিক ব্রডগেজ কোচ। পাশাপাশি আরও শত শত নতুন বগি কেনার জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানায়, রেলের কোচ সংকট কাটানোর উদ্যোগ চলমান রয়েছে। এই সংকট নিরসনে আগামী কয়েক বছরে দেড় হাজারের বেশি রেলের কোচ কেনা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে কোচ আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিকভাবে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) অর্থায়নে ভারত থেকে ২০০ কোচ আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ৫০০ কোচ কেনার ব্যাপারে অর্থায়নের বিষয় সম্মত হয়েছে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কোচ কেনার জন্য অর্থায়নের খোঁজ চালানো হচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের কোচের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি পূরণে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। ভারত থেকে ২০০ কোচ আনা হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে। আমরা কোচ কেনার জন্য ডোনার খোঁজ করছি। তবে এরই মধ্য এডিবি (এশিয়ান ডেভালপমেন্ট ব্যাংক) ২০০ কোচ ও ইডিসি (ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোপোরেশন) ৩০০ কোচ কেনায় অর্থায়ন করতে সম্মত হয়েছে। আশা করছি, আমরা প্রয়োজনীয় কোচ কিনতে ডোনার পেয়ে যাবো এবং সংকট কাটিয়ে উঠবো।’
জুলাইয়েই আসছে ভারতের কোচ
ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) অর্থায়নে কয়েক বছর আগে ভারত থেকে ২০০ কোচ আনার বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছিল। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বিআইটিইএস লিমিটেড এই ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজগুলো সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট আওয়ীমী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক অবনতি হলে সেই উদ্যোগ থেমে যায়।
তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটছে। চুক্তি অনুযায়ী সেই ২০০ কোচ আনার প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে একাধিক সংসদ সদস্যের প্রশ্নে রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও জানিয়েছেন, আগামী জুন মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ভারত থেকে রেলের ২০০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ আসবে।
আরও পড়ুন
উন্নত হচ্ছে রেল যোগাযোগ, বাজেটে বাড়ল বরাদ্দ
‘ঢাকা-চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটে চলবে চীনের বুলেট ট্রেন’
তবে রেলওয়ে সূত্রগুলো বলছিল, আগামী আগস্ট মাস থেকে ভারত থেকে ব্রডগেজ কোচগুলো আসা শুরু হচ্ছে। তবে সবশেষ রেলওয়ে বলছে, চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহেই ২০টি কোচের একটি চালান দেশে এসে পৌঁছাবো।
কথা হলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আগস্ট নয়, এই জুলাইয়ে একটি চালান আসবে। আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি যতদ্রুত সম্ভব কোচগুলো সংগ্র্রহ করা। আমরা চাচ্ছি আগামী তিন মাসের মধ্যে (২০০ কোচের মধ্যে) বড় অংশ নিয়ে আসা।’
রেলওয়ে জানায়, ২০২৪ সালের ২০ মে ১২০৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী বগি সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আরআইটিইএস লিমিটেডের চুক্তি হয়েছিল। এই বগিগুলো স্টেইনলেস স্টিলের এবং দ্রুত গতিসম্পন্ন। এতে বগির ছাদে এসি ছাড়াও অটোমেটিক এয়ার ব্রেক পদ্ধতি থাকবে এবং তা পরিবেশবান্ধব হবে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, চলতি মাসের শেষ দিকে ভারত থেকে প্রথম ধাপে ২০টি বগি দেশে পৌঁছালে তা ঢাকা-পাবনা রুটে যু্ক্ত হবে।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক মহিউদ্দীন বলেন, যে বগিগুলো জরাজীর্ণ সেগুলো নতুন বগি দিয়ে পরিবর্তন করা হবে। আবার কিছু বগি যুক্ত করা হবে। এতে ওই রুটের (ঢাকা-পাবনা) বগির সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
কোচ সংকটে নিরসনে অর্থায়নের খোঁজ
রেলের প্রায় রুটেই কোচের সংকট চলছে। অনেক ট্রেন চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ বগি দিয়ে। কোচগুলোর বেশির ভাগই জরাজীর্ণ। রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ বলছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কোচের সংকট কাটাতে অন্তত ১৬৩০টি বগি কেনা জরুরি।
জানা গেছে, রেলের পশ্চিমাঞ্চলে চলমান ৯টি ব্রডগেজ আন্তঃনগর ট্রেনের বগিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। পাশাপাশি ৪৩টি ব্রডগেজ ট্রেনের ২৫টি রেকের জন্য খাবার বগি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরা, কেবিন, শোভন চেয়ার, শোভন শ্রেণির ৪২৩টি বগি দরকার। এছাড়া ১৩ মিটারগেজ আন্তঃনগর ট্রেনে ৫৩টি বগি প্রয়োজন।
ব্রডগেজ ও মিটারগেজ মিলিয়ে শুধু ২০২৭ সালের মধ্যে ৫৬ আন্তঃনগর ট্রেনের জন্য ৪৭৬টি নতুন বগি দরকার। পাশাপাশি মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেনের জন্য লাগবে আরও ২৩৮টি নতুন কোচ। অর্থাৎ চলমান ট্রেনের জন্য সাত শতাধিক নতুন কোচ দরকার।
এদিকে নতুন নতুন যেসব রুট চালু হয়েছে সেগুলোতেও ট্রেন চালাতে বড় সংখ্যা কোচ কেনা জরুরি। রেলওয়ে পরিবহন বিভাগ বলছে, পদ্মা রেল সংযোগ, দোহাজারী-কক্সবাজার, খুলনা-মোংলা এবং অন্যান্য নতুন রেলপথে আন্তঃনগর ট্রেন চালু করতে ৭৬৬টি বগি প্রয়োজন। এসব রুটে নতুন লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনের জন্য ১৫০ নতুন বগি প্রয়োজন।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বগির চাহিদা পূরণে প্রক্রিয়া চালাচ্ছে রেলওয়ে। কিন্তু প্রয়োজনীয় বগিগুলো কিনতে মূল সমস্যা হচ্ছে অর্থায়ন। তবে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে চেষ্টা চলছে। এরমধ্যেই ৫০০ বগি কেনায় এডিবি (এশিয়ান ডেভালপমেন্ট ব্যাংক) ও ইডিসি (ইকুনোমিক ডেপালমেন্ট করপারেশন) অর্থায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যান্য বৈশ্বিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গেও অর্থায়নের ব্যাপারে আলোচনা চলছে।
এএম/জেবি




