মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
রাত গভীর হলে একবার বাসার সামনে যেতেন জাকির হোসেন। খুব বেশি সময় থাকতেন না। স্ত্রী ও ছোট সন্তানকে একনজর দেখে আবার বেরিয়ে পড়তেন। বিদায়ের মুহূর্তে স্ত্রীর হাত ধরে বলতেন, বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে, না হলে রোজ হাশরে। এরপর রাত কাটত টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে। ভোর হলে আবার ফিরে যেতেন উত্তরার আন্দোলনের মিছিলে।
জুলাইয়ের আন্দোলনের দিনগুলো এভাবেই কেটেছে তার। দিনের আলোয় রাজপথ, রাতে খোলা মাঠ—এটাই ছিল তার জীবন। পুলিশ ও ছাত্রলীগের ভয়ে নিজের বাসায় থাকা ছিল প্রায় অসম্ভব। আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে ছররা গুলিতে আহত হন। পরে ছাত্রলীগের হামলায় আবার গুরুতর জখম হন। সেই আঘাতের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। চোখে ঝাপসা দেখেন, কোমরের ব্যথায় ভারী কাজ করতে পারেন না। চিকিৎসা চলছে, তবে পুরোপুরি সুস্থ হননি।
জুলাইয়ের দিনগুলোতে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে নিয়মিত অবস্থান করতেন জাকির। সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলত। তবে তার মূল দায়িত্ব ছিল আহতদের পানি পান করানো। শহীদ মুগ্ধ আহত হওয়ার পর তাকেও পানি পান করিয়েছিলেন। পুরো আন্দোলনজুড়ে সহযোদ্ধাদের পানি পান করানোই ছিল তার অন্যতম দায়িত্ব।
আহত হওয়ার পর বায়িং হাউসের চাকরিতেও আর নিয়মিত হতে পারেননি। ফলে এখন অনেকটাই বেকার জীবন কাটছে তার।
সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, গুলি খাওয়ার পরও যে বেঁচে আছি, এটাই বড় কথা। আমার চোখের সামনে অনেকে গুলি খেয়ে মারা গেছেন। অনেকে আহত হয়ে এখনো পঙ্গু হয়ে আছেন। তাদের তুলনায় আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন।
রড ও লাঠি দিয়ে পিটিয়েছিল ছাত্রলীগের কর্মীরা
জাকির জুলাইয়ের শুরু থেকেই আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় ছিলেন। ১৮ জুলাই তিনি বিএনএস সেন্টারের সামনে ছিলেন। সে সময় জমজম টাওয়ারের সামনে থেকে একটি মিছিল এসে সেখানে যোগ দেয়। অন্যদের সঙ্গে তিনিও আন্দোলনে অংশ নেন। স্লোগান দেওয়া এবং পুলিশের বাধার মুখে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল তাদের কাজ।
জাকির বলেন, আমরা যখন আন্দোলন করছিলাম, তখন মুগ্ধ মারা যায়। ওই সময় আমিও আহতদের পানি পান করিয়েছি। পরদিন ১৯ জুলাই শুক্রবার বিকেলে বের হলে পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে আহত হই। আমার মাথা, হাত ও পায়ে গুলি লাগে। এরপর কিছুদিন আন্দোলনে বিরতি আসে। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এরপরও আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাই। পরে ৩ আগস্ট ৯ নম্বর সেক্টরে ছাত্রলীগের একটি মিছিল আসে। আমার হাতে লাঠি দেখে তারা আমাকে আটক করে। এরপর বেধড়ক মারধর করে।
তিনি বলেন, আমাকে একা পেয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা রড ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। বুকে আঘাত করে। সেই ব্যথা নিয়েই এখনো বেঁচে আছি। হামলাকারীদের সবার মাথায় হেলমেট ছিল।
জাকির বলেন, আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি। কোনো ছাড় দেয়নি। ওই এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা আফসার খানের অনুসারীরাই আমাকে মারধর করে। মারধরের কারণে আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না। পরে তারা আমাকে তাবলিগের একজন কর্মী হিসেবে চিনতে পারে। এতে সেদিন প্রাণে বেঁচে যাই।
জাকির জানান, ১৯ জুলাই পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে আহত হওয়ার পর বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান। কিন্তু সেখানে পুলিশ অভিযান চালায়। পরে সেখান থেকে পালিয়ে উত্তরার একটি সেক্টরের গলির ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
রাতে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে, দিনে আন্দোলনে
জুলাইয়ের আন্দোলনের রাতগুলো জাকিরের কাছে ছিল ভয়াবহ। খোলা মাঠে নির্জন স্থানে ঘুমাতে হতো। রাতে বাসায় যেতে পারতেন না। পরিবার থাকলেও পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার ভয়ে তাদের থেকে দূরে থাকতে হতো। তাই রাত কাটত টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে। সকাল হলে আবার আন্দোলনে যোগ দিতেন। এভাবেই জুলাই মাস ও ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময় কেটেছে তার।
জাকির বলেন, আমার বাসায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লোকজন গেছে। পুলিশও আমাকে ধরতে গেছে। তাই রাতে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে ঘুমিয়েছি, আর দিনে আন্দোলন করেছি। তখন আমার সামনে অনেক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, কয়েকজন মারা গেছেন। ওই দিনের কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে গেছি।
ছাত্রলীগের হামলার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন
৩ আগস্টের হামলার ক্ষত এখনো জাকিরকে ভোগাচ্ছে। তিনি ঠিকমতো চোখে দেখতে পারেন না। ভারী কাজ করতেও কষ্ট হয়।
তিনি বলেন, এখন ঠিকমতো চোখে দেখতে পারি না। হাঁটতেও কষ্ট হয়। কোমরে অনেক সমস্যা। ডাক্তার এমআরআই করতে বলেছেন। কিন্তু টাকার অভাবে তা করাতে পারিনি। চোখেও কম দেখি। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছেন। চশমাও নিয়েছি। কিন্তু এখনো ভালো হতে পারিনি।
তবু কোনো আক্ষেপ নেই
জুলাইয়ের আন্দোলনে ছররা গুলিতে আহত হওয়ার কারণে এখনো চোখে কম দেখেন জাকির। নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তবু তার কোনো আক্ষেপ নেই।
তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, এটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। এ জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি। আমাদের অনেক ভাইয়ের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করি। এখনো অনেক আহত ভাই কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন। কারও চোখ নেই, কারও হাত নেই, কারও পা নেই। আমরা চাই, স্বৈরাচার হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে মামলা হোক এবং তাদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক।
বেঁচে থাকলে ফিরব, না হলে দেখা হবে রোজ হাশরে
জুলাইয়ের রাতগুলোতে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে ঘুমাতে পারতেন না জাকির। তাই রাতের কোনো একসময় চুপিসারে বাসায় যেতেন। স্ত্রীকে দেখে আবার বেরিয়ে আসতেন। যাওয়ার সময় স্ত্রীর হাত ধরে বলতেন, হয়তো এটাই শেষ বিদায়। ক্ষমা করে দিও। হয়তো আর দেখা হবে না।
এভাবেই প্রতিদিন বিদায় নিতেন। তবে ভাগ্যক্রমে এখনো বেঁচে আছেন।
জাকির বলেন, প্রথম দিকে আমার স্ত্রী ও সন্তানরা আমাকে বাসার বাইরে যেতে দিত না। পরে তাদের বুঝিয়ে বলি। তখন স্ত্রীকে বলতাম, বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে। আর যদি মারা যাই, তাহলে রোজ হাশরে দেখা হবে। তোমরা আমার জন্য দোয়া কোরো।
তিনি বলেন, এসব কথা শুনে স্ত্রী-সন্তান কান্নায় ভেঙে পড়ত। কিন্তু বুকে পাথর বেঁধেই ঘর ছাড়তাম। এরপর আর বাসায় থাকা সম্ভব হয়নি।
জাকির বলেন, প্রতি রাতে পুলিশ ও ছাত্রলীগের লোকজন বাসায় যেত। তারা আমাকে খুঁজত। ভয়ে স্ত্রী আমার বাবা-মাকে বলতেন, আমি আন্দোলনে গেছি। প্রথম দিকে তারা বাধা দিলেও পরে বলতেন, যাও, আন্দোলন সফল করে বাড়ি ফিরো।
এমআইকে/এআর