জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর উত্তরায় মীর মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসানসহ ২৬ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি হয়। আজ এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষ হয়েছে।
শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম আসামিদের বিরুদ্ধে আনা দুটি অভিযোগ পড়ে শোনান। ঘটনার বীভৎসতা, মুগ্ধসহ অন্যদের হত্যার বর্ণনা এবং আসামিদের কার কী দায় রয়েছে— তা তুলে ধরে অভিযোগ গঠনের আর্জি জানান তিনি।
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, তারেক আবদুল্লাহসহ প্রসিকিউশনের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আমির হোসেন ও এম হাসান ইমাম শুনানিতে তাদের মক্কেলদের মামলা থেকে অব্যাহতির (ডিসচার্জ) আবেদন করেন।
আইনজীবী আমির হোসেন ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তাদের আসামি করা হয়েছে। এজন্য তারা অব্যাহতি পেতে পারেন।’
আসামিপক্ষের বাকি আইনজীবীদের শুনানির জন্য ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৩ জুলাই পরবর্তী দিন ধার্য করেছে।
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রসিকিউশন বলেছে, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে শেখ হাসিনা মারণাস্ত্র ব্যবহার করে যে কোনো মূল্যে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির মাধ্যমে সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হয়। এতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য নেতারাও সায় দেন।
এরই অংশ হিসেবে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ১৭ ও ১৮ জুলাই ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশন বলছে, ১৮ জুলাই উত্তরার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশপাশ এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশে নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান, গ্যাস শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়।
একই সময়ে ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক এমপি মোহাম্মদ হাবিব হাসানের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ১৫০ থেকে ২০০ জন সশস্ত্র নেতাকর্মী আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় বলে প্রসিকিউশনের ভাষ্য।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৮ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছোড়ে।
এ সময় উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের রবীন্দ্র সরণিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন বিইউপি শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। আসামিদের ছোড়া গুলিতে তিনি বিদ্ধ হন। সতীর্থরা তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
একই দিন উবারচালক মোখলেসুর রহমান ওরফে দুর্জয়কে পুলিশের এপিসির (সাঁজোয়া যান) চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করা হয়। প্রসিকিউশন বলছে, লাশ গুমের উদ্দেশ্যে পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মরদেহ প্রথমে উত্তরা পূর্ব থানার পানির পাম্প ঘরে লুকিয়ে রাখে। রাতে সেই লাশ উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে ২০ জুলাই টঙ্গীর মরকুন বিল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এছাড়া জাহিদুজ্জামান তানভীন, ফাহমিন জাফর, শাকিল হোসেন, সাব্বির হোসেন ও ডা. সজিব সরকার সেদিন গুলিতে নিহত হন এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হন।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই একই এলাকায় পুনরায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ জয়সহ চারজনকে হত্যা করা হয়। প্রসিকিউশন বলছে, দুটি অভিযোগেই এসব ঘটনা পরিকল্পিত, ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’।
এই মামলায় ২৬ আসামির মধ্যে আটজন গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন- ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মির্জা সালাহউদ্দিন, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক ওসি মো. মজিবুর রহমান, আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক কনস্টেবল মো. হোসেন আলী, উত্তরা পশ্চিম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোয়ার ইসলাম চৌধুরী রবিন, যুবলীগ সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন রুবেল, আওয়ামী লীগ নেতা মো. সোহেল রানা, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি মো. শাহ আলম এবং তুরাগ থানার আওয়ামী লীগ কর্মী মো. ইরফানুল হক গাজী।
পলাতক ১৮ জন হলেন— সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হাবিব হাসান, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার কাজী আশরাফুল আজীম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. তোহিদুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ কমিশনার সুমন কর, উত্তরা পশ্চিম থানার সাবেক ওসি বিএম ফরমান আলী, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান, কনস্টেবল মো. আবু ছায়েম, আওয়ামী লীগ নেতা মো. আলাউদ্দিন আল সোহেল, সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন, মো. ফরিদ আহমেদ, ডিএম শামীম, মো. আনিছুর রহমান নাঈম ও মো. আফছার উদ্দিন খান, এসআই খালেদ আনোয়ার, এএসআই মো. রোকনুজ্জামান, ছাত্রলীগ নেতা মুরতাফা বিন ওমর এবং যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন।
আরএনবি/এমআই




