শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

২১ জুলাই: কোটা নিয়ে আপিল বিভাগের রায়, কারফিউয়ের মধ্যেও থামেনি আন্দোলন

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২৬, ০১:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

২১ জুলাই: কোটা নিয়ে আপিল বিভাগের রায়, কারফিউয়ের মধ্যেও থামেনি আন্দোলন
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে ২১ জুলাই একটি সন্ধিক্ষণের দিন। ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে ২১ জুলাই একটি সন্ধিক্ষণের দিন। আগের কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কারফিউ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা, অসংখ্য হতাহত এবং দেশজুড়ে অচলাবস্থার মধ্যে এদিন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে কোটা প্রশ্নের আইনি জটিলতার অবসানের পথ তৈরি হয়। কিন্তু আদালতের সেই রায় আন্দোলনের ইতি টানতে পারেনি। বরং আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। শিক্ষার্থীদের দাবির কেন্দ্রে চলে আসে নিহতদের বিচার, আহতদের পুনর্বাসন, গ্রেফতারদের মুক্তি এবং আন্দোলন দমনে জড়িতদের জবাবদিহি।

১৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সহিংসতা ১৮, ১৯ ও ২০ জুলাইয়ে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা শহর এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সরকার কারফিউ জারি করে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থমকে যায়।

এই অস্থিরতার মধ্যেই ২১ জুলাই সবার দৃষ্টি ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দিকে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করছিলেন কোটা ইস্যুতে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি আসে।

সেদিন আপিল বিভাগ হাইকোর্টের পূর্বের রায় বাতিল করে সরকারি চাকরিতে নতুন কাঠামো নির্ধারণ করেন। রায় অনুযায়ী, মোট ৯৩ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং অবশিষ্ট ৭ শতাংশ পদে বিভিন্ন সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য কোটা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের জন্য এই কোটা নির্ধারণ করা হয়।

রায় ঘোষণার পর সরকারের পক্ষ থেকেও তা বাস্তবায়নের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, এর মধ্য দিয়েই হয়তো আন্দোলনের অবসান ঘটবে।

কিন্তু বাস্তবে চিত্র ছিল ভিন্ন। আন্দোলনকারীরা জানান, কয়েক দিনের সংঘর্ষে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের রক্তের বিনিময়ে আন্দোলন নতুন বাস্তবতায় পৌঁছেছে। তাই শুধুমাত্র কোটা প্রশ্নের সমাধান এখন আর যথেষ্ট নয়।

শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে কয়েকটি দাবি সামনে আনেন। এর মধ্যে ছিল—নিহতদের হত্যার বিচার, আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ, গ্রেফতার হওয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের নিঃশর্ত মুক্তি, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং আন্দোলন দমনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

ফলে ২১ জুলাই থেকে আন্দোলনের ভাষা ও লক্ষ্য উভয়ই পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এটি আর কেবল সরকারি চাকরির নিয়োগনীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির বৃহত্তর আলোচনায় পরিণত হয়।

সেদিনও সারাদেশে কারফিউ কার্যকর ছিল। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে টহল দেয়। গণপরিবহন সীমিত আকারে চলাচল করলেও অধিকাংশ মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হননি।

অনেক এলাকায় দোকানপাট বন্ধ ছিল। শিল্পকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি অফিসেও স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। ইন্টারনেট সেবা সীমিত থাকায় তথ্য আদান-প্রদানেও জটিলতা অব্যাহত ছিল।

২১ জুলাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মূল অবস্থান ছিল শান্তিপূর্ণভাবে পরবর্তী কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া এবং আদালতের রায়ের পর নতুন দাবিগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী সংগঠনের সমন্বয়কারীরা বিবৃতি দিয়ে জানান, আন্দোলন চলবে যতক্ষণ না নিহতদের বিচার, গ্রেফতারদের মুক্তি এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।

সেদিনের আলোচনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পায়, আপিল বিভাগের রায়কে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ। নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি। আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আহ্বান। গ্রেফতার হওয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মুক্তির দাবি। কারফিউ, দমন-পীড়ন ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি। আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে সমন্বয়।

জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২১ জুলাই ছিল একটি 'টার্নিং পয়েন্ট'। আদালতের রায়ে কোটা সংস্কারের পথ খুলে গেলেও আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর অনেক বিস্তৃত হয়ে যায়। এই দিন থেকেই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে বিচার, জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

পরবর্তী দিনগুলোতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সেই নতুন দাবিগুলোকেই সামনে নিয়ে এগোয় এবং শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এর গভীর প্রভাব পড়ে।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ২১ জুলাই তাই শুধু একটি আদালতের রায় ঘোষণার দিন নয়; এটি এমন এক দিন, যেদিন একটি আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন সেদিন থেকে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর প্রশ্নে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

উল্লেখ্য, ২১ জুলাই নতুন করে অন্তত সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এছাড়া আগের সংঘর্ষে আহত আরও ছয়জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এতে ১৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় মোট প্রাণহানি অন্তত ১৪০ জনে পৌঁছায় বলে সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়।

এম/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর