Dhaka Mail Logo

জাতীয়

হকারে গিলে খাচ্ছে সাড়ে ৯ কোটি টাকার ফুটওভার ব্রিজ!

মাহফুজুর রহমান

১১ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ পিএম

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট, পথচারীদের দুর্ভোগ ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে অত্যাধুনিক ফুটওভার ব্রিজ। আধুনিক নকশা, প্রশস্ত হাঁটার পথ এবং চলন্ত সিঁড়ির সুবিধা সম্বলিত এ ব্রিজটি উদ্বোধনকালে বলা হয়েছিল, এটি হবে পথচারীবান্ধব ও দখলমুক্ত একটি নিরাপদ পারাপারের মাধ্যম। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই সেই ব্রিজ এখন কার্যত হকার ও অস্থায়ী দোকানিদের দখলে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিউমার্কেটের সামনে নির্মিত ফুটওভার ব্রিজটির ওপরে হাঁটার পুরো অংশের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছে অনেক দোকান। কাপড়, মোবাইলের কভার ও চার্জার, প্রসাধনী, খেলনা, গৃহস্থালির সামগ্রী, সানগ্লাস, ব্যাগ, কৃত্রিম গয়নাসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে সেসব দোকানে। একসময় যে পথ দিয়ে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারত, সেখানে এখন দোকানের সারির মাঝখান দিয়ে সরু একটি পথ ধরে চলাচল করতে হচ্ছে।

1

ব্রিজের নিচের চিত্রও একই রকম। সিঁড়ির প্রবেশমুখের দুই পাশজুড়ে বসেছে অস্থায়ী দোকান। কোনো কোনো স্থানে এত বেশি দোকান বসানো হয়েছে যে, দূর থেকে বোঝার উপায় নেই, কোথায় ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ি আর কোথায় দোকানের সারি। 

প্রথমবার এ এলাকায় আসা পথচারীদের অনেককেই সিঁড়ি খুঁজে বের করতে হাঁপিয়ে ওঠেন। কেউ কেউ এক দোকান থেকে আরেক দোকানের ফাঁক গলে প্রবেশের পথ খোঁজেন। আবার অনেককেই বাধ্য হয়ে ব্রিজ ব্যবহার না করে সরাসরি ব্যস্ত সড়ক পার হতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাকিব হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে এসেছি। নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার জন্য ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে চাই, কিন্তু অনেক সময় সিঁড়ির মুখই খুঁজে পাওয়া যায় না। দোকানের কারণে ওঠানামা করতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও ভিড়ের মধ্যে পড়তে হয়।’

3

একজন নারী পথচারীর অভিযোগ, ছোট সন্তানকে নিয়ে ব্রিজে ওঠা অত্যন্ত কষ্টকর। দোকান ও মানুষের ভিড়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার জায়গা নেই। যে ব্রিজ মানুষের সুবিধার জন্য করা হয়েছে, সেটিই এখন নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন প্রবীণ, নারী, শিশু ও শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরা। দোকানের কারণে পথ সরু হয়ে যাওয়ায় অনেক সময় একসঙ্গে দুজন মানুষও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন না। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করা মানুষের জটলা এবং দোকানিদের ডাকাডাকিতে পুরো ব্রিজ এলাকা যেন একটি ভাসমান বাজারে পরিণত হয়েছে।

5

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো পথচারীদের নিরাপদ, দ্রুত ও নির্বিঘ্নে সড়ক পারাপারের সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু সেখানে যদি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়, তাহলে অবকাঠামোটির মৌলিক উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এতে একদিকে পথচারীদের দুর্ভোগ বাড়ে, অন্যদিকে মানুষ ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার থেকে নিরুৎসাহিত হয় এবং ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিউমার্কেট এলাকায় যে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি মূলত পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু জনগুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো যদি শেষ পর্যন্ত হকারদের দখলে চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের এই বিনিয়োগের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায় পুরো শহরের ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়াকে যেন স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছি। কিন্তু ফুটওভার ব্রিজের সংখ্যা তো খুব বেশি নয়। নগরীতে প্রায় শতাধিক ফুটওভার ব্রিজ রয়েছে। এগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সেগুলোকে অবশ্যই হকারমুক্ত রাখতে হবে। যদি রাষ্ট্র এই কাজটুকুও করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নগর শাসন বা গভর্ন্যান্স কীভাবে কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।’

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এই দখলদারিত্ব স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে না। এর পেছনে একটি চক্র রয়েছে, যারা হকারদের বসার সুযোগ করে দিচ্ছে এবং বিনিময়ে অর্থ আদায় করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কেন বারবার এই চক্রকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে? তাদের শক্তির উৎস কোথায়? সিটি করপোরেশনের তদারকির দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তারা কেন অবহেলা করছে? আর যদি তারা সত্যিই কোনো কারণে ব্যর্থ হয়ে থাকে, তাহলে সে বিষয়ে তারা রাষ্ট্রকে কী জানিয়েছে?’

6

তিনি বলেন, ‘যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, হকারদের পেছনের চক্র সিটি করপোরেশন বা রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী, তাহলে সেটিও প্রকাশ্যে তুলে ধরা উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে কোনো কার্যকর প্রতিবাদ বা উদ্যোগ নেই। ফলে এক ধরনের নীরব সম্মতি তৈরি হয়েছে। এর খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন এবং নানা ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।’

তার কথা, ‘এ পরিস্থিতি বন্ধ করতে হবে। নগরীর সব ফুটওভার ব্রিজকে নিরবচ্ছিন্নভাবে হকারমুক্ত রাখার জন্য রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গাফিলতি থাকলে তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে।’

20

আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু হকার উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যারা এই চক্রকে পরিচালনা করে, হকারদের বসতে দেয় এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ভবিষ্যতে যেন কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ড পুনরাবৃত্তি করতে না পারে, সে জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’ 

নিউমার্কেট এলাকা রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক অঞ্চল। এখানে রয়েছে অসংখ্য বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি অফিস। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এ এলাকায় যাতায়াত করে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও ক্রেতাদের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যার সময়। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপদ চলাচলের কথা বিবেচনা করেই অত্যাধুনিক সুবিধাসংবলিত ফুটওভার ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

40

তবে প্রশ্ন উঠেছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কীভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যে দখল হয়ে গেল? সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত তদারকি করছে কি না, উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা কেন স্থায়ী ফল দিচ্ছে না এবং জনস্বার্থে নির্মিত এই অবকাঠামো রক্ষার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কার- এমন নানা প্রশ্ন এখন পথচারীদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে হকার উচ্ছেদের অভিযান চালানো হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। ফলে ফুটওভার ব্রিজের ওপর ও নিচে গড়ে ওঠা অস্থায়ী বাজার ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

নগর ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, ফুটওভার ব্রিজ ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত নজরদারি, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং পথচারীদের চলাচলের স্থানকে দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে কঠোর প্রশাসনিক অবস্থান গ্রহণ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

60

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। তবে অভিযান শেষে কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরে হকাররা আবার ফিরে এসে বসে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো সংস্থা হকারদের বসতে দেয় না। তারা নিজেরাই এসে বসে পড়ে। মানুষের চলাচলের জায়গা দখল করে নেয়। আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করি, কিন্তু কিছুদিন পর আবার তারা ফিরে আসে। সিটি প্রশাসন একা এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে না।’

80

নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজ হকারদের জন্য নির্মাণ করা হয়নি। এটি মানুষের নিরাপদ চলাচলের জন্য করা হয়েছে। কয়েকজন হকারের কারণে হাজারো মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নিউমার্কেটের মতো ব্যস্ত এলাকায় জনগণেরও সচেতন হতে হবে এবং এমন অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।’

তবে তিনি এও বলেন, ‘অনেকে বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা না করে হকার উচ্ছেদ করা ঠিক নয়। কিন্তু ঢাকার ধারণক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। রাজধানী ইতোমধ্যে তার ধারণক্ষমতার চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি চাপ বহন করছে। জনসংখ্যা, যানবাহন, ভবন—সবকিছুই পরিকল্পনার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে যানজট, জলাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।’

ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘একটি কক্ষে চারজন থাকার জায়গায় যদি আট থেকে দশজনকে রাখা হয়, তাহলে সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবেই। ঢাকার অবস্থাও অনেকটা সেরকম। ঢাকা উত্তরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ২০ হাজার মানুষ বাস করেন, আর ঢাকা দক্ষিণে এই সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। পুরান ঢাকার কোনো এলাকায় আগুন লাগলে সরু রাস্তার কারণে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি মানসম্মত শহরের জন্য কত শতাংশ সবুজ এলাকা, কত শতাংশ জলাশয়, কতগুলো খেলার মাঠ এবং কতসংখ্যক মানুষের বসবাস উপযোগী হবে এসবের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। কিন্তু ঢাকায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই সেই মানদণ্ড ভেঙে পড়েছে। তাই শুধু সিটি করপোরেশন নয়, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’

00

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই জনসাধারণের চলাচলের স্থানগুলো দখলমুক্ত রাখতে। এ বিষয়ে আমরা আমাদের মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখব।’

নিউমার্কেটের আধুনিক ফুটওভার ব্রিজটি আজ একটি বড় প্রশ্নের প্রতীক। নিরাপদ পারাপারের জন্য নির্মিত এই অবকাঠামো যদি কয়েক মাসেই ভাসমান বাজারে পরিণত হয়, তাহলে নগর উন্নয়ন ও জনস্বার্থে ব্যয় করা বিপুল অর্থের প্রত্যাশিত সুফল কতটা অর্জিত হলো, তারই উত্তর খুঁজছে নগরবাসী।

এম/এএইচ