ঢাকার পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা। রাজধানীর কোলাহল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের এই জনপদ এখন দেশের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য এখানে রূপ নেয় নতুন কাঁচামালে। কারও কাছে যেগুলো আবর্জনা, জিঞ্জিরার শত শত কারখানা ও হাজারো শ্রমিকের কাছে সেগুলোই জীবিকার উৎস।
বাংলাদেশে প্লাস্টিক শিল্পের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে পুনর্ব্যবহার খাতও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় জিঞ্জিরা গড়ে উঠেছে একটি বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক শিল্পাঞ্চল হিসেবে। এখানে প্রতিদিন পুরোনো প্লাস্টিক নতুন জীবনের সন্ধান পায়। তবে এই শিল্প যেমন অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, তেমনি পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি করছে নানা প্রশ্ন।
বিজ্ঞাপন
প্লাস্টিক বর্জ্যের যাত্রা
জিঞ্জিরার শিল্পচক্রের শুরু হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে। ঢাকা শহরের আবাসিক এলাকা, বাজার, শপিংমল, শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, এমনকি দূরবর্তী জেলা থেকেও ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়। এই সংগ্রহ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিশাল একটি অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক।
পথশিশু, টোকাই, ভাঙারি ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালা এবং ছোট ছোট সংগ্রহকারী দল শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য কিনে বা সংগ্রহ করে। পরে এগুলো পাইকারি আড়তে বিক্রি হয়। সেখান থেকে ট্রাক বা ভ্যানে করে প্লাস্টিকের বস্তা জিঞ্জিরার বিভিন্ন কারখানায় পৌঁছায়।
একজন শ্রমিকের ভাষায়, “যে বোতল মানুষ ডাস্টবিনে ফেলে দেয়, সেটাই আমাদের কাছে টাকা। যত বেশি প্লাস্টিক আসবে, তত বেশি কাজ হবে।”
বিজ্ঞাপন
_20260619_013226721.jpg)
বাছাইয়ের কঠিন প্রক্রিয়া
কারখানায় আসার পর প্রথম কাজ হলো বর্জ্য বাছাই। কারণ সব ধরনের প্লাস্টিক একসঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করা যায় না। পানির বোতল, সফট ড্রিংকের বোতল, শ্যাম্পুর প্যাকেট, প্লাস্টিকের ড্রাম, পলিথিন, ভাঙা চেয়ার বা গৃহস্থালি সামগ্রী—প্রতিটির উপাদান আলাদা।
শ্রমিকরা হাতে হাতে এসব প্লাস্টিক আলাদা করেন। রং, গঠন, ঘনত্ব এবং উপাদানের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তূপে ভাগ করা হয়। এই কাজ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আধুনিক যন্ত্রের পরিবর্তে মানুষের শ্রমের ওপর নির্ভর করতে হয়।
একটি মাঝারি কারখানায় প্রতিদিন কয়েক টন প্লাস্টিক বাছাই করা হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শ্রমিকরা ধুলাবালি, দুর্গন্ধ এবং নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন।
ধোয়া ও পরিষ্কারকরণ
বাছাই শেষ হলে প্লাস্টিক ধোয়ার পর্যায় শুরু হয়। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের গায়ে ময়লা, কাদা, রাসায়নিক পদার্থ, খাবারের উচ্ছিষ্ট কিংবা অন্যান্য দূষিত উপাদান লেগে থাকে। এগুলো পরিষ্কার না করলে ভালো মানের পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামাল তৈরি করা সম্ভব নয়।
বড় বড় পানির ট্যাংক বা কংক্রিটের চৌবাচ্চায় প্লাস্টিক ধোয়া হয়। কোথাও কোথাও ডিটারজেন্ট বা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। এরপর মেশিনের সাহায্যে পানি ঝরিয়ে শুকানোর ব্যবস্থা করা হয়।
তবে অনেক কারখানায় বর্জ্য পানি পরিশোধনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে দূষিত পানি সরাসরি আশপাশের খাল বা ড্রেনে চলে যায়। পরিবেশবিদদের মতে, এই দিকটি এখনও শিল্পটির অন্যতম বড় দুর্বলতা।
কুচি থেকে দানা
ধোয়ার পর প্লাস্টিকগুলো বিশেষ যন্ত্রে কুচি করা হয়। এই পর্যায়ে বড় আকারের প্লাস্টিক ছোট ছোট টুকরোয় পরিণত হয়। এরপর এগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় গলানো হয়।

গলিত প্লাস্টিক মেশিনের মাধ্যমে সরু ফিতার মতো বের হয়ে আসে। পরে ঠান্ডা করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানায় কেটে ফেলা হয়। এই দানাগুলোকে শিল্পের ভাষায় গ্র্যানুলস বলা হয়।
গ্র্যানুলসই হলো পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক শিল্পের মূল কাঁচামাল। বিভিন্ন কারখানা এই দানা কিনে নতুন পণ্য উৎপাদন করে। অর্থাৎ ডাস্টবিনে ফেলা একটি প্লাস্টিক বোতল একসময় আবার বালতি, ড্রাম, চেয়ার, পাইপ কিংবা অন্য কোনো পণ্যে রূপ নিতে পারে।
অর্থনীতির অদৃশ্য শক্তি
জিঞ্জিরার প্লাস্টিক রিফাইনারি শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশে প্লাস্টিকজাত কাঁচামালের একটি বড় অংশ পুনর্ব্যবহার খাত থেকে আসে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায়।
এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষ জড়িত। সংগ্রহকারী, পরিবহন শ্রমিক, বাছাইকারী, কারখানার কর্মচারী, যন্ত্রচালক, ব্যবসায়ী—সব মিলিয়ে একটি বিশাল অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্ব্যবহার শিল্পের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পুনরায় অর্থনীতির চক্রে ফিরে আসছে। অন্যথায় এসব বর্জ্যের বড় অংশ নদী, খাল, মাঠ কিংবা ল্যান্ডফিলে জমা হয়ে পরিবেশের জন্য আরও বড় হুমকি সৃষ্টি করত।
শ্রমিকদের জীবন
জিঞ্জিরার কারখানাগুলোর প্রাণ হলো শ্রমিকরা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অসংখ্য নারী-পুরুষ এই শিল্পকে সচল রাখছেন। তাঁদের অনেকেই গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসেছেন।
অনেক শ্রমিকের কাজের পরিবেশ খুব একটা নিরাপদ নয়। গরম চুল্লি, ধোঁয়া, শব্দ, ধুলাবালি এবং রাসায়নিকের সংস্পর্শে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়। পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম সব কারখানায় পাওয়া যায় না।
তবু জীবিকার তাগিদে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এই শিল্প। ফলে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শ্রমিকদের কাছে জিঞ্জিরার কারখানাগুলো জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
প্লাস্টিক বাছাই শ্রমিক মো. সোহেল মিয়া বলেন, “প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত পর্যন্ত প্লাস্টিক বাছাই করি। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে কত ধরনের প্লাস্টিক আসে, তার কোনো হিসাব নেই। বোতল, পলিথিন, ড্রাম, ভাঙা চেয়ার—সবকিছু আলাদা করতে হয়। কাজটা সহজ মনে হলেও আসলে অনেক কষ্টের। সারাদিন ধুলাবালি আর ময়লার মধ্যে থাকতে হয়। তারপরও এই কাজের ওপরই আমার পুরো পরিবার নির্ভর করে। অনেকেই এসব প্লাস্টিককে আবর্জনা মনে করেন, কিন্তু আমাদের কাছে এগুলোই রুজির উৎস।”
পরিবেশের প্রশ্ন
প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার শিল্প পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও এর নিজস্ব কিছু পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
অনেক কারখানায় নিম্নমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ফলে প্লাস্টিক গলানোর সময় ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ সৃষ্টি হয়। এছাড়া ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত দূষিত পানি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার বর্জ্যও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু এলাকায় বাতাসে প্লাস্টিক পোড়ানোর গন্ধ পাওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, বর্জ্য শোধনাগার এবং কঠোর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই সমস্যাগুলো অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
অগ্নিঝুঁকি ও নিরাপত্তা সংকট
প্লাস্টিক শিল্পের আরেকটি বড় সমস্যা অগ্নিঝুঁকি। প্লাস্টিক অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ হওয়ায় সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
জিঞ্জিরা ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় অতীতে বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সরু রাস্তা, ঘনবসতি এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাব অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পাঞ্চল পরিকল্পনা, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
বিশ্ববাজার ও নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বজুড়ে এখন টেকসই উন্নয়ন এবং সার্কুলার ইকোনমির ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মূল কথা হলো বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় জিঞ্জিরার মতো শিল্পাঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এই খাতে আরও বড় অবস্থান তৈরি করতে পারে।

অনেক উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করেছেন। কেউ কেউ পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির দিকেও ঝুঁকছেন। ফলে ভবিষ্যতে এই শিল্প আরও সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর রূপ পেতে পারে।
পরিবর্তনের অপেক্ষায় জিঞ্জিরা
জিঞ্জিরার প্লাস্টিক রিফাইনারি শিল্প একদিকে যেমন হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস, অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের পুনর্ব্যবহার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। প্রতিদিন যে প্লাস্টিক বর্জ্যকে মানুষ অপ্রয়োজনীয় মনে করে ফেলে দেয়, সেই বর্জ্যই এখানে নতুন মূল্য পায়।
তবে শিল্পটির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
বুড়িগঙ্গার তীরের এই শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন অসংখ্য হাত প্লাস্টিক বর্জ্যকে নতুন জীবনে ফিরিয়ে আনছে। ধুলো, ধোঁয়া, শব্দ আর ব্যস্ততার ভেতর গড়ে উঠেছে এক অনন্য অর্থনৈতিক জগৎ। জিঞ্জিরার কারখানাগুলো শুধু প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে না, তারা আসলে বর্জ্যকে সম্পদে, পরিত্যক্ত জিনিসকে সম্ভাবনায় এবং ফেলে দেওয়া উপকরণকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করছে। এই কারণেই বাংলাদেশের পুনর্ব্যবহার শিল্পের ইতিহাসে জিঞ্জিরার নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হবে বহু বছর ধরে।
কর্মরত শ্রমিক শাহীন আলম (৪১) বলেন, “জিঞ্জিরার প্লাস্টিক শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক চক্র। এখানে যে বর্জ্য আসে, তার বেশিরভাগই পুনরায় ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালে পরিণত হয়। এর ফলে একদিকে পরিবেশে প্লাস্টিকের চাপ কমে, অন্যদিকে নতুন শিল্পের কাঁচামাল তৈরি হয়। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। সরকার এবং উদ্যোক্তারা একসঙ্গে কাজ করলে এই শিল্প আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।”
এম/এআর




