পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের (সাবেক ভিক্টোরিয়া পার্ক) পাশ দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করেন। কিন্তু পার্কের উত্তর পাশে লাল ইটের যে পুরনো স্থাপনাটি আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, সেটিই একসময় ছিল ঢাকার আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র।
‘ভিক্টোরিয়া ওয়াটার পাম্প’ বা ‘ভিক্টোরিয়া ওয়াটার ট্যাংক’ নামে পরিচিত এই স্থাপনাই ১৮৭৮ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাসিন্দাদের পাইপলাইনের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করেছিল। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই স্থাপনাটি শুধু একটি পাম্পঘর নয়, বরং রাজধানীর জনস্বাস্থ্য, প্রকৌশল ও নগর উন্নয়নের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।
মহামারির শহর থেকে আধুনিক নগরে
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার অধিকাংশ মানুষ পানীয় জলের জন্য পুকুর, কূপ ও বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। এসব উৎসের পানি দূষিত হওয়ায় কলেরা, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ প্রায়ই মহামারির রূপ নিত। ১৮৬৪ সালে ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর শহরের জন্য নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।
কীভাবে শুরু হয় প্রকল্প
১৮৭১ সালে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি নগর উন্নয়নের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দান করেন। পরে ১৮৭৪ সালে তিনি শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সভা করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পে সহযোগিতার আহ্বান জানান। পর্যাপ্ত অর্থ না উঠলেও তিনি নিজেই আরও এক লাখ টাকা অনুদান দেন এবং শর্ত দেন, শহরের মানুষ যেন বিনামূল্যে এই পানি ব্যবহার করতে পারে। পরবর্তীতে নবাব আহসানউল্লাহ আরও অর্থ সহায়তা দেন এবং ব্রিটিশ সরকারও প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করে। এরপর চাঁদনীঘাটে পানি শোধনাগার এবং ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশে ওভারহেড ট্যাংক ও পাম্প স্থাপনের কাজ শুরু হয়।

নির্মাণ ও উদ্বোধন
প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ১৮৭৮ সালে। ২৪ মে ১৮৭৮ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাসিন্দারা পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিশোধিত বিশুদ্ধ পানি পান। উদ্বোধন করেন তৎকালীন ঢাকার কমিশনার এফ. বি. পিকক। এই দিনটিকেই ঢাকার আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে ধরা হয়।
কীভাবে কাজ করত এই পাম্প
চাঁদনীঘাটের পানি শোধনাগারে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি পরিশোধন করা হতো। এরপর বাষ্পচালিত পাম্পের মাধ্যমে সেই পানি বাহাদুর শাহ পার্কের পাশের উঁচু জলাধারে তোলা হতো। সেখান থেকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাহায্যে লোহার পাইপলাইনের মাধ্যমে সদরঘাট, ইসলামপুর, বাংলাবাজার, লক্ষ্মীবাজারসহ তৎকালীন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়া হতো। সে সময়ের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক একটি প্রকৌশল ব্যবস্থা।
স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য
ভিক্টোরিয়া ওয়াটার পাম্প ভবনটি লাল ইট দিয়ে নির্মিত। এর উঁচু দেয়াল, খিলানযুক্ত দরজা-জানালা এবং শক্তিশালী কাঠামো ব্রিটিশ শিল্প স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। প্রায় পাঁচতলা সমান উচ্চতার এই স্থাপনাটি দূর থেকেই নজর কাড়ে। নির্মাণে চুন-সুরকি ও সে সময়ের উন্নত প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, যার ফলে দেড় শতাব্দী পরও ভবনটি টিকে আছে।
কেন বন্ধ হয়ে যায়
সময়ের সঙ্গে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। পুরোনো ওভারহেড ট্যাংক ব্যবস্থায় এত বিপুল চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। ট্যাংক ভরতে দীর্ঘ সময় লাগত, পাম্পের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ছিল বেশি এবং উচ্চচাপের কারণে অনেক সময় পাইপলাইনে সমস্যাও দেখা দিত। ১৯৮০-এর দশক থেকে ধীরে ধীরে ওভারহেড ট্যাংকভিত্তিক ব্যবস্থা বন্ধ হতে শুরু করে। পরে গভীর নলকূপ ও আধুনিক পাম্পিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি পানি সরবরাহ চালু হওয়ায় ভিক্টোরিয়া ওয়াটার পাম্পও অচল হয়ে পড়ে।

বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে ভবনটি আর পানি সরবরাহে ব্যবহৃত হয় না। তবে এটি এখনো পুরান ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। স্থাপত্যবিদ, ইতিহাস গবেষক ও ঐতিহ্যপ্রেমীরা একে ঢাকার প্রাচীন নগর অবকাঠামোর মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবিষয়ক বিভিন্ন তালিকায়ও এটি ঢাকার প্রথম ওভারহেড পানির ট্যাংক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পানির ট্যাংকটির নিচে একটি মাজার স্থাপিত হয়েছে। সেই জায়গাটি পরবর্তীতে সংস্কার করে টাইলস লাগানো হলেও ভবনের বাকি অংশে সংস্কারের চিহ্নও নেই। আস্তর ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। পানির ট্যাংকটির ছাদে বিভিন্ন গাছ জন্মেছে।
সংরক্ষণের দাবি
ইতিহাসবিদ ও নগর গবেষকদের মতে, ভিক্টোরিয়া ওয়াটার পাম্প শুধু একটি পুরনো ভবন নয়; এটি ঢাকার জনস্বাস্থ্য ও নগর পরিকল্পনার ইতিহাসের সূচনালগ্নের স্মারক। যথাযথ সংরক্ষণ, তথ্যফলক স্থাপন এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে উন্নয়ন করা হলে এটি দেশি-বিদেশি পর্যটক ও গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এই ট্যাংকিটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এই পানির ট্যাংকিগুলো শহরের জন্য এক একটি রিসোর্স বা সম্পদ। এগুলোকে পরিত্যক্ত না রেখে কীভাবে সর্বোচ্চ উপযোগিতা পাওয়া যায়, তার পরিকল্পনা করা উচিত। বর্তমানে এগুলোর কোনো সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ দরকার কি না, তার একটি সঠিক অ্যাসেসমেন্ট বা মূল্যায়ন প্রয়োজন। এটি শহরের একটি ঐতিহ্যের অংশ এবং কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে উদাসীনতা অত্যন্ত হতাশাজনক।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বাপ্পী তালুকদার বলেন, ‘ভিক্টোরিয়া ওয়াটার পাম্প শুধু একটি পুরনো ভবন নয়; এটি ঢাকায় আধুনিক নগরসেবার সূচনার প্রতীক। শুনেছি উনিশ শতকের এই স্থাপনার মাধ্যমে পাইপলাইনে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ শুরু হয়। জনস্বাস্থ্য রক্ষা, নগর পরিকল্পনা এবং প্রকৌশল প্রযুক্তির ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বহু মানুষ আজও জানে না, রাজধানীর প্রথম আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার স্মারক এটি।’

ব্যবসায়ী মো. আব্দুল করিম বলেন, ‘বাহাদুর শাহ পার্কের পাশ দিয়ে বহু বছর ধরে যাতায়াত করছি। ভবনটা দেখেছি, কিন্তু এটা যে ঢাকার প্রথম পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ ছিল, তা আগে জানতাম না। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে মানুষকে জানানো দরকার। সরকার ভবনটি সংরক্ষণ করলে নতুন প্রজন্ম ঢাকার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।’
শিক্ষার্থী রুমানা আক্তার বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে জানি, কিন্তু নিজের শহরের এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সম্পর্কে খুব কমই জানি। ভিক্টোরিয়া ওয়াটার পাম্পের ইতিহাস জেনে অবাক হয়েছি।’
রিকশাচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন এই এলাকার যাত্রী নিয়ে যাই, কিন্তু কেউ এই ভবনের ইতিহাস নিয়ে কথা বলে না। পুরনো ভবনটি দেখলে বোঝা যায় এটি অনেক আগের।’
বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকার দীর্ঘদিনের এক বাসিন্দা বলেন, ‘প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই ভবনের পাশ দিয়ে চলাচল করেন, কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন এটি ঢাকার প্রথম আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ ছিল। ভবনটি এখনো শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু যথাযথ পরিচর্যা ও প্রচারের অভাব রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যদি ভবনটি সংস্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে এবং এর ইতিহাস তুলে ধরে, তাহলে এটি পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ভ্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনও বিকশিত হবে।’
এম/এএইচ




