মহিউদ্দিন রাব্বানি
০৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম
- পরিবহন খাতে বছরে ব্যয় হয় ৬৫ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি
- নিবন্ধিত ইভি মাত্র ৬৬৯টি, চলাচল করছে লাখো বৈদ্যুতিক যান
- নীতিমালা ও অবকাঠামো পেলেই গতি পাবে ইভি খাত
বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে সরকার ও ব্যবসায়ীরা। কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি)। বাংলাদেশেও এ খাতকে ভবিষ্যতের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশনের অভাব, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট, মানসম্মত ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত নীতিমালার ঘাটতি এ শিল্পের বিকাশের প্রধান বাধা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ইভি খাত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির বিকল্প হতে পারে ইভি
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, দেশে পরিবহন খাতে প্রতিবছর প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি প্রয়োজন হয়, যার বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই এর প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে।
তার মতে, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
সম্ভাবনা বড়, নিবন্ধিত ইভি এখনো খুব কম
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ থ্রি হুইলার চলাচল করলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধিত ইভি গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৬৬৯টি।
তিনি বলেন, ‘বাস্তবে সড়কে চলাচলকারী বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তবে সঠিক তথ্যভান্ডার না থাকায় পরিকল্পনা গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।’
তাসকীন আহমেদের মতে, চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড নির্ধারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে এ খাতের ব্যাপক বিকাশ সম্ভব।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎই ইভি খাতের প্রধান শর্ত
বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, ইভি খাতের সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ‘একদিকে ইভির ব্যবহার বাড়ানো হবে, অন্যদিকে যদি বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকে, তাহলে এই খাত কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারবে না। এজন্য বিদ্যুৎ অবকাঠামোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়াতে হবে।’
ওয়াহিম হোসেনের মতে, ইভি খাতের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সেল বা কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন।
চার্জিং অবকাঠামো বড় চ্যালেঞ্জ
ইভি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো চার্জিং অবকাঠামো।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) পরিচালক মো. আমিনুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত ৩২টি চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেওয়া হলেও চালু হয়েছে মাত্র ৯টি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সারাদেশে পর্যাপ্ত চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে না উঠলে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে ইভির ব্যবহার প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না। এজন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দ্রুত চার্জিং স্টেশন স্থাপন জরুরি।
চূড়ান্ত নীতিমালার অপেক্ষায় ইভি শিল্প
শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান জানান, বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পের জন্য একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি বলেন, নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
কর্মসংস্থান ও রফতানির নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশ অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি এবং রানার অটোমোবাইলস পিএলসির চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান বলেন, ইভি শিল্প দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তার মতে, ব্যাটারি, মোটর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ উৎপাদনের মাধ্যমে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় শিল্পায়নের পাশাপাশি রফতানির নতুন বাজারও তৈরি হবে।
ডিজেল আমদানিতে ইতিবাচক প্রভাব
বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান বলেন, দেশে বৈদ্যুতিক থ্রি হুইলারের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন ডিজেল আমদানি কমেছে। এটি শুধু জ্বালানি ব্যয় কমায়নি, বরং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কম পরিচালন ব্যয়ে বাড়ছে ইভির আকর্ষণ
আকিজ মটরসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আমিন উদ্দিন জানান, প্রচলিত জ্বালানিচালিত যানবাহনের তুলনায় ইভির পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। তার মতে, জ্বালানি খরচ কম হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীরা উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয় করতে পারেন, যা ইভির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
>> আরও পড়ুন
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইভি খাতের বিকাশে কয়েকটি বিষয় দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, সারাদেশে চার্জিং স্টেশন সম্প্রসারণ, মানসম্মত ব্যাটারি ব্যবহার নিশ্চিত করা, নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি, শুল্ক ও আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি।
সঠিক পরিকল্পনায় সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যাশা
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক নীতিমালা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাত নতুন গতি পাবে।
এমআর/এমআর