- জুনে দ্বিগুণ-তিনগুণ বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ
- প্রিপেইড মিটারেও অস্বাভাবিক টাকা কর্তন
- মিটার রিডিংয়ে অনিয়মের অভিযোগ
- সিস্টেম লস সমন্বয়ে বাড়তি বিল
- অতিরিক্ত বিল তদন্তের নির্দেশ
- অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা
- নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ক্যাবের
রাজধানী থেকে জেলা শহর, মফস্বল থেকে গ্রামাঞ্চল, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সদ্য গত হওয়া জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অসংখ্য গ্রাহকের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও জুন মাসে তাদের বিল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ, তিন গুণ এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক গুণ বেশি এসেছে।
প্রিপেইড ও পোস্টপেইড উভয় ধরনের গ্রাহকদের কাছ থেকেই অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনা চলছে, আর বিদ্যুৎ বিভাগ অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।
ভুক্তভোগী জোসনা আহমেদ জবা জানান, তিনি ডিপিডিসির প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করেন। গত জুন মাসে তার বিদ্যুৎ খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কোম্পানির অ্যাপের তথ্য অনুযায়ী, ৮ জুন ২৫৮ টাকা, ১৮ জুন ২১৬ টাকা, ২২ জুন ১১৪ টাকা, ২৬ জুন ১২৬ টাকা এবং ৩০ জুন ১২৮ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না থাকলেও এভাবে টাকা কাটা অস্বাভাবিক।
এই গৃহিনী বলেন, আমার বাসায় শুধু লাইট, ফ্যান ও ফ্রিজ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ টাকার বেশি খরচ হয় না। কিন্তু গত মাসে অস্বাভাবিক হারে টাকা কাটা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে সরকারের কাছে পরিত্রাণ চাই।
নেসকোর গ্রাহক আমির সোহেলও অতিরিক্ত বিলের কারণে ভোগান্তির কথা জানান। তিনি বলেন, হঠাৎ করেই অতিরিক্ত বিল আসা শুরু করেছে। এক হাজার টাকা রিচার্জ করার তিন দিনের মধ্যেই প্রায় ৩৫০ টাকা কমে গেছে। অথচ বিদ্যুৎ ব্যবহারে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, মাসের শেষের দিকে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ হঠাৎ টাকা কেটে নেওয়া হয়। লাখো গ্রাহকের কাছ থেকে এভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু সবাই অভিযোগ করতে যান না। অভিযোগ করতে গিয়ে হয়রানি ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় বলে অনেকেই অতিরিক্ত বিল মেনে নিয়ে পরিশোধ করে দেন।
সাভারের বাসিন্দা আমিনুল ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তিনি জানান, মে মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল প্রায় ৮৫০ টাকা। কিন্তু জুন মাসে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। তার প্রশ্ন, বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না থাকা সত্ত্বেও এক মাসের ব্যবধানে বিল তিন গুণের বেশি বেড়ে যাওয়ার কারণ কী?
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সজিবু রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, সাধারণত তার মাসিক বিদ্যুৎ খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু জুন মাসে এসে সেই খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, এটা পুরোপুরি ভুতুড়ে ব্যাপার মনে হচ্ছে। আগে কখনো এমন হয়নি। একই ব্যবহার, কিন্তু বিল কয়েক গুণ বেশি।
ডেমরার শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রায় প্রতি বছরই জুন মাসে অতিরিক্ত বিল আসে। অভিযোগ দিয়েও কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায় না। এ বছরও তিন হাজার টাকা বেশি বিল এসেছে। শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদেরই অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করতে হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকরা। বিদুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজের এক পোস্টে ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন।
আহসান উল্লাহ নামের এক ব্যক্তি বলেন, সরাসরি অফিসে বা হটলাইনে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে, কিন্তু এগুলো কোনো কার্যকর সমাধান নয়। যদি ভুল বিল হয়ে থাকে তাহলে জুলাই মাসের বিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে দিলেই হয়। অনেক গ্রাহকের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ, এমনকি তিন গুণ বিল করা হয়েছে। আবার জুনের মধ্যেই বিল পরিশোধের জন্য এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে।
প্রিপেইড মিটার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মহিরুল আজম। তিনি বলেন, ১ জুলাই বিকাশের মাধ্যমে রিচার্জ করেছি। সেখানে ৪০ টাকা মিটার রেন্ট কেটে নেওয়া হয়েছে। অথচ সরকার আগে ঘোষণা দিয়েছিল মিটার ভাড়া কাটা বন্ধ করা হবে। তাহলে সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন হলো কোথায়?
ডিজিটাল মিটারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সুমন মিয়াজি বলেন, নিম্নমানের ডিজিটাল মিটার স্থাপনের ফল এখনো মানুষ ভোগ করছে। দ্রুত মানসম্মত মিটার স্থাপন করা প্রয়োজন।
বিল বৃদ্ধির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে রিফাত মেহেদী বলেন, মে মাসে আমার বিল ছিল প্রায় ১১ হাজার ৫০০ টাকা। জুন মাসে সেটি বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৯৬৮ টাকা। ব্যবহারে তেমন কোনো পরিবর্তন ছিল না।
অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগের মধ্যে হবিগঞ্জে এক নারী গ্রাহকের নামে ২ কোটি ৫৭ লাখ ৩৫ হাজার ১০৪ টাকার বিদ্যুৎ বিল ইস্যুর ঘটনাও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানায়, এটি তথ্য সংযোজনের সময় কম্পিউটারজনিত ভুলের কারণে হয়েছে এবং বিলটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয় না। কোথাও অনুমানভিত্তিক বিল করা হয়, আবার কোথাও কয়েক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যোগ করে বিল প্রস্তুত করা হয়। ফলে অনেক গ্রাহক উচ্চতর স্ল্যাবে চলে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধে বাধ্য হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অর্থবছরের শেষ দিকে হিসাব সমন্বয়ের চাপ থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ইউনিট দেখিয়ে বিল তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ নতুন নয়। সিস্টেম লস কম দেখানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো কিংবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।
শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ খাতে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মিটার রিডিংয়ের ছবি সংরক্ষণ, অনলাইনে যাচাইয়ের সুযোগ এবং জবাবদিহি বাড়ানো ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি ডি রহমতউল্লাহও জবাবদিহির অভাবের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থাতেও ভুল বা অনিয়ম হতে পারে। কিন্তু এসবের দায় কার, তা নির্ধারণ না হলে সমস্যার সমাধান হবে না।
এদিকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, দেশের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ সেল সক্রিয় রাখা হয়েছে। অভিযোগ পেলে দ্রুত সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনগণকে সেবা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের আরও আন্তরিক হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, জুন মাসে অতিরিক্ত বিল পাওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিল তৈরিতে কোনো করণিক বা কারিগরি ভুল থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করতে হবে। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের এক পর্যালোচনা সভায়ও গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, অতিরিক্ত বিলের কারণ অনুসন্ধান এবং সেবার মানোন্নয়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ গ্রাহক প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট ও আধুনিক মিটার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং বিলিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের বিতর্ক অনেকাংশে কমে আসবে।
তবে গ্রাহকদের প্রশ্ন রয়ে গেছে, যদি সত্যিই বিল তৈরিতে ভুল হয়ে থাকে, তাহলে কেন প্রতি বছর জুন মাস এলেই একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে? আর যদি ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিক ব্যবহারে বিল কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা কী?
এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এবং কার্যকর সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত ‘ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল’ নিয়ে জনমনে সংশয় ও ক্ষোভ কাটবে না বলেই মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
এমআর/জেবি




