একে সালমান
০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
*হামলার ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় অভিযোগ দিলেও মামলা নেয়নি পুলিশ
*কুপিয়ে হত্যার এক দিন আগেও হামলা করা হয় বিএনপি নেতা সাদ্দামের ওপর
রাজধানীর আদাবর এলাকায় দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে বিএনপির নবোদয় হাউজিং ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় ইউনিটটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন গুরুতর আহত হন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের এক দিন আগেও সাদ্দাম হোসেনের ওপর হামলা হয়েছিল। সে ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, নবোদয় কাঁচাবাজার ও আশপাশ এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মিরাজের রাজনৈতিক কার্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বাজারের ফুটপাত, বিভিন্ন গ্যারেজ ও মাদকের স্পট থেকে কথিত সমিতির নামে চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে রিপনের বিরুদ্ধে। তার নেতৃত্বে একটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় বলে স্থানীয়দের দাবি। এসব কর্মকাণ্ডে বাধা দিলেই হামলার শিকার হতে হয়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।
হামলার নেপথ্যে যারা
আদাবরের নবোদয় হাউজিং ইউনিটের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার ও সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের ওপর হামলার নেপথ্যে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা জড়িত। তাদের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের নেতা মাসুম এ হামলার নেতৃত্ব দেয়। মাসুমের সঙ্গে তার ভাই রবিন ও নাহিদ ছিল। এ ছাড়া রিপন, নিরব, পারভেজ, মজনু, সুমন ও শহিদ সরাসরি হামলায় জড়িত ছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হামলার নেপথ্যে থাকা মাসুমের নামে একাধিক হত্যা মামলাসহ অনেক মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার পরও আদাবরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় যুবদল নেতা সজীব আহমদ রানার সঙ্গে প্রকাশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে তাঁকে দেখা যায়। এ ছাড়া স্থানীয় কিশোর গ্যাং চক্রের মূলহোতা হিসেবে সে পরিচিত।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
নবোদয় কাঁচাবাজার এলাকায় ভ্যানের সবজির দোকান ও ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে কথিত সমিতির নামে চাঁদা তোলা হয়। এ চাঁদার টাকা স্থানীয় ১০০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিরাজ ও রিপন আদায় করেন। ফুটপাত থেকে এ চাঁদা তোলা নিয়ে এর আগে কয়েক দফায় মিরাজের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন: আদাবরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক ৩
এ ঘটনার জের ধরে গত ২৯ জুন রাত আড়াইটায় ব্রাজিল-জাপান ফুটবল খেলার দিন মিরাজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে কাজ করা রিপনের ছোট ভাই নিরব আদাবর থানা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হাবিব হাসানের বাসার সামনে গিয়ে উচ্চস্বরে ঢোল বাজায়। বিষয়টি নিয়ে হাবিব হাসান তাকে প্রথমে উচ্চৈঃস্বরে ঢোল বাজাতে নিষেধ করলে একপর্যায়ে বাগবিতণ্ডা হয়। এ নিয়ে হাবিব হাসান নিরবকে থাপ্পড় দেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা হাবিব হাসানকে খুঁজতে আসে। তাকে না পেয়ে নিহত সাদ্দামের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও সাদ্দাম কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা বিষয়টি মীমাংসার জন্য দুই পক্ষকে নিয়ে বসেন। সেখানেই বিচার শেষে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দেশীয় ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করে আবুল বাশারকে কুপিয়ে হত্যা এবং সাদ্দাম হোসেনকে আহত করে।
স্বজনরা আতঙ্কে
আহত সাদ্দাম হোসেনের মা কোকিলা খাতুন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার সন্তানকে যারা কুপিয়ে আহত করেছে, তাদের শাস্তি চাই। ঘটনায় এখনো আমরা মামলা করিনি। তবে আমরা মামলা করব। কাউকে ছাড় দেব না।
তিনি আরও বলেন, হয়তো মামলা করার পর আমার ওপর কিংবা আমার স্বজনদের ওপর আবারও হামলা হতে পারে। যদি প্রশাসন তাদের ছেড়ে দেয়, তাহলে আইনের প্রতি আর কোনো শ্রদ্ধা থাকবে না।
নিহত আবুল বাশারের বড় ভাই সবুজ মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, আবুল বাশার একটি সালিশ বৈঠকে গিয়েছিলেন। সেখানে খেলা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের মীমাংসা করে ফেরার পথে ৮ থেকে ১০ জন তাদের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে আবুল বাশার ও সাদ্দাম গুরুতর আহত হন।
স্থানীয় নেতাকর্মীর বক্তব্য
আদাবর থানা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হাবিব হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপে ২৯ জুন (সোমবার) রাতে জাপান-ব্রাজিল ফুটবল খেলার দিন আমার বাসার সামনে রিপনের ভাই নিরব এসে উচ্চৈঃস্বরে ঢোল বাজাচ্ছিল। আমি হার্টের রোগী। প্রথমে আমি তাকে উচ্চস্বরে ঢোল বাজাতে নিষেধ করলে তারা কয়েকজন মিলে আরও জোরে ঢোল বাজাতে থাকে। পরে আমি নিরবকে ডেকে একটি থাপ্পড় দিই। এ ঘটনার পর নিরবের ভাই রিপন আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে কোপানোর জন্য খুঁজতে থাকে। বিষয়টি আমার ভাগনে সাদ্দাম হোসেন জানতে পেরে তাদের ডেকে সাবধান করে দেয়। ওই সময় তারা সাদ্দামের ওপর চড়াও হয়ে তাকে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয়।

এ ঘটনার পর সাদ্দাম প্রথমে আদাবর থানায় অভিযোগ দিলে পুলিশ আসে। কিন্তু বিএনপি নেতা মিরাজ ঘটনাস্থল মোহাম্মদপুর থানার আওতাভুক্ত বলে পুলিশকে জানায়। পরে বিষয়টি মোহাম্মদপুর থানায় অভিযোগ দিতে বলা হলে সেখানে সাদ্দাম একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা না হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার জন্য আমরা বসি।
তিনি ঢাকা মেইলকে আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে গতকাল রাত ৮টায় নবোদয় হাউজিং এলাকায় বসার পর মীমাংসা করে দুই পক্ষকে মিলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মীমাংসার পর সাদ্দাম বের হয়ে রাস্তায় যাওয়া মাত্রই পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওত পেতে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তার ওপর এবং ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাশার মিয়ার ওপর হামলা করে। তাদের গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাদ্দাম হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাশার মিয়া এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাগুলো মূলত এক দিনের নয়। দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ঘটনারই বহিঃপ্রকাশ এগুলো। নবোদয় বাজারে ফুটপাত ও সবজির দোকানে সমিতির নামে চাঁদা তোলাসহ নানা ঘটনা নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল চলছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ এ হত্যাকাণ্ড।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক বিএনপি নেতা বলেন, নবোদয় কাঁচাবাজার ও আশপাশে চাঁদাবাজি, ময়লা বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বিএনপি নেতা মিরাজ। তাঁর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এসব ঘটনা ঘটেছে। মূলত বিএনপির কমিটিতে মিরাজ কোনোভাবেই দলীয় পদ পাওয়ার যোগ্য নন। তিনি কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজ চক্র লালন-পালন করেন। এ কারণে তাকে দলীয় সভা-সমাবেশে কাজে লাগাতে পদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলেই স্থানীয় বিএনপির মধ্যে অন্তঃকোন্দল দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজধানীর মৌচাকে বিএনপি নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
তবে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো আইনি সহায়তা না পাওয়ার ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেসবাহ উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা ঢাকা মেইলকে বলেন, নিহত আবুল বাশার বিএনপির নবোদয় হাউজিং ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিল-জাপান ম্যাচের দিন খেলা দেখা নিয়ে বাঁশি বাজানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি নেতা হাবিব ও এক কিশোরের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধের জেরে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। বুধবার রাতে আদাবরের নবোদয় কাঁচাবাজার ডি-ব্লকের ১ নম্বর সড়কে সালিশ বৈঠকের শেষ পর্যায়ে আবারও সংঘর্ষ হয়। এ সময় সন্ত্রাসীরা মো. আবুল বাশার ও সাদ্দাম হোসেনকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। এ ঘটনার পর আহত অবস্থায় আবুল বাশারকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
একেএস/এআর