মাহফুজুর রহমান
২৯ জুন ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম
একসময় রাজধানীর শিশুদের অন্যতম প্রিয় বিনোদনকেন্দ্র ছিল শহীদ জিয়া শিশু পার্ক। আধুনিকায়নের জন্য ২০১৯ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয় পার্কটি। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি কাজ। ফলে একটি প্রজন্ম পার্কটিতে যাওয়ার সুযোগই পায়নি। দীর্ঘসূত্রতায় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিয়ে।
ঢাকার মানুষের কাছে শহীদ জিয়া শিশু পার্ক শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়, শৈশবের অসংখ্য স্মৃতির অংশ। ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করা পার্কটি কয়েক দশক ধরে রাজধানীর শিশুদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য ছিল। ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে বেড়ানো, নাগরদোলায় চড়া, ট্রেনে ঘোরা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর স্মৃতি এখনও অনেকের মনে উজ্জ্বল।
আশির ও নব্বইয়ের দশকে শিশু পার্কে যাওয়া অনেক পরিবারের জন্য ছিল বিশেষ আয়োজন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের নানা জেলা থেকে মানুষ ঢাকায় এসে সন্তানদের নিয়ে পার্কটিতে ঘুরতে যেতেন। স্বল্প খরচে বৈচিত্র্যময় বিনোদনের সুযোগ থাকায় এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর শিশুদের জন্য সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বড় বিনোদনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল শহীদ জিয়া শিশু পার্ক। প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত পার্কটিতে ছিল নানা ধরনের রাইড ও বিনোদনের ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এটি রাজধানীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের সবচেয়ে সহজলভ্য বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

কেন বন্ধ করা হয়েছিল
সময়ের সঙ্গে পার্কটির বিভিন্ন রাইড ও অবকাঠামো পুরোনো হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আধুনিক সুবিধার প্রয়োজন বিবেচনায় ২০১৯ সালে পার্কটি বন্ধ করে আধুনিকায়ন প্রকল্প শুরু করা হয়।
পরিকল্পনা ছিল আন্তর্জাতিক মানের নতুন রাইড, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আধুনিক ল্যান্ডস্কেপিং এবং ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণের। তবে প্রকল্প শুরুর সাত বছর পরও তা বাস্তবায়ন শেষ হয়নি।
দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে প্রকল্প
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রশাসনিক জটিলতা, নকশা পরিবর্তন, দরপত্র-সংক্রান্ত জটিলতা এবং করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের গতি বারবার থেমে গেছে। এ সময়ে একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। বেড়েছে ব্যয়ও।
নগরবাসীর প্রশ্ন, একটি শিশু পার্কের আধুনিকায়নে এত দীর্ঘ সময় কেন লাগছে। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য না থাকায় অসন্তোষও বাড়ছে।
একটি প্রজন্ম পার্ক দেখেনি
২০১৯ সালে যেসব শিশুর বয়স ছিল তিন বা চার বছর, তারা এখন স্কুলের মধ্যম শ্রেণিতে পড়ছে। কিন্তু তারা কখনও শিশু পার্কে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।
শিক্ষার্থী তাসনিম আক্তার বলে, ‘মা প্রায়ই বলেন, ছোটবেলায় তিনি শিশু পার্কে যেতেন। আমি কখনও যেতে পারিনি।’
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈম হাসান বলে, ‘ইউটিউবে ভিডিও দেখে মনে হয়েছে জায়গাটা অনেক সুন্দর। কবে খুলবে, জানি না।’

উৎসবের দিনে থাকত উপচে পড়া ভিড়
বন্ধ হওয়ার আগে ঈদ, পয়লা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস কিংবা স্কুলের ছুটির সময় পার্কটিতে হাজারো দর্শনার্থীর সমাগম হতো।
অনেক সময় টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যেত। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো পার্কজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করত। শিশুরা রাইডে চড়তে ব্যস্ত থাকত, আর অভিভাবকেরা গাছের ছায়ায় বসে সময় কাটাতেন। রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে স্বস্তির একটি জায়গা হিসেবে শিশু পার্কের আলাদা গুরুত্ব ছিল।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কজুড়ে নির্মাণকাজের বিভিন্ন চিহ্ন রয়েছে। তবে আগের রাইডগুলোর কোনো অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। নতুন করে কী ধরনের রাইড স্থাপন করা হবে, সে বিষয়েও দৃশ্যমান কোনো তথ্য নেই।
একসময় যেখানে শিশুদের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন নীরবতা। নির্মাণাধীন অবকাঠামো ছাড়া শিশুদের জন্য বিনোদনের কোনো পরিবেশ দেখা যায় না।
শাহবাগ এলাকার বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘মাঝে মাঝে কাজ চলতে দেখা যায়। এখনও মনে হয় কাজ চলছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চলার কোনো মানে নেই। দ্রুত কাজ শেষ করে পার্কটি খুলে দেওয়া উচিত।’
পরিকল্পনা নিয়েই প্রশ্ন
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, প্রকল্পটি শুরু থেকেই পরিকল্পনাগত দুর্বলতায় ভুগছে।
তিনি বলেন, ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্কের আধুনিকায়ন প্রকল্পটি শুরু থেকেই সঠিক পরিকল্পনার ঘাটতিতে ভুগছে। একটি সাধারণ শিশু পার্ককে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় প্রকল্পে রূপ দেওয়া হয়েছে।’
আরও পড়ুন: নামেই পার্ক, বাস্তবে কংক্রিটের মাঠ
তার মতে, প্রকল্পে বিশাল আকারের রাইড, ভূগর্ভস্থ পার্কিংসহ নানা ব্যয়বহুল অবকাঠামো যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাস্তবতা যাচাই ও পেশাদার মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে অদক্ষতা ও দুর্নীতির প্রভাব থাকতে পারে। এতে যেমন ব্যয় বেড়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষও এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে।’
তার ভাষ্য, দীর্ঘ সাত বছর পার্কটি বন্ধ থাকায় রাজধানীর বিপুলসংখ্যক শিশু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন ও মানসিক বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই প্রকল্প দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি পার্কটিকে সব শ্রেণির মানুষের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী রাখাও জরুরি।

শিশুদের জন্য বিনোদনের সংকট
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকায় শিশুদের জন্য উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্র ও খেলার মাঠের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। উন্মুক্ত স্থানও সংকুচিত হচ্ছে।
ফলে অনেক পরিবারকে শিশুদের নিয়ে বেসরকারি বিনোদনকেন্দ্রে যেতে হয়, যেখানে খরচ তুলনামূলক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ নগরজীবনের জন্য শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
আরও পড়ুন: ছুটির দিনে দর্শনার্থীতে মুখর রমনা পার্ক
জবাবদিহিতার প্রশ্ন
দীর্ঘদিনেও প্রকল্প শেষ না হওয়ায় জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ না হওয়ার কারণ জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। একই সঙ্গে প্রকল্পের অগ্রগতির নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

যা বলছে সিটি করপোরেশন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, শিশু পার্কটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি মাস্টারপ্ল্যানের অংশ। এখানে ভূগর্ভস্থ পার্কিংসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১৫টি নতুন রাইড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রাইড স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে কারিগরি যাচাই-বাছাই, ব্যয় নির্ধারণ এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছে। বর্তমানে দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান।
নূর আজিজুর রহমান বলেন, রাইডগুলো বিদেশে তৈরি করে দেশে আনতে হবে। অর্ডার দেওয়ার পর সেগুলো আসতে সাধারণত ১১ থেকে ১২ মাস সময় লাগে। এরপর স্থাপন ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও রয়েছে।
পার্কটি কবে খুলে দেওয়া হবে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। ঠিকাদার নিয়োগের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি আরও স্পষ্ট হবে।
তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও রাজধানীবাসী আশা ছাড়ছেন না। তাদের প্রত্যাশা, একদিন আবারও শিশুদের হাসি, আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠবে শাহবাগের এই ঐতিহ্যবাহী বিনোদনকেন্দ্র।
এম/এআর