ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৪ জুন ২০২৬, ১০:৫৭ পিএম
দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশের এক সময়ের আলোচিত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর ইন্টারপোলের সহযোগিতায় গত শুক্রবার (১২ জুন) তাকে গ্রেফতার করা হয়।
রোববার (১৪ জুন) সংসদ অধিবেশনে এ খবর জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এও জানান, বেনজীর আহমেদকে খুব শিগগির দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় তাকে আনা হবে, সেটা নিয়েই এখন আলোচনা।
বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালনের সময় নানা ঘটনায় বারবার আলোচনায় আসেন ‘শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ’ বেনজীর আহমেদ।
রোববার সাবেক এই আইজিপির গ্রেফতারের বিষয়টি নিয়ে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবো।’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বক্তৃতা ও বিবৃতিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সেই রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেনজীর আহমেদ। এরপর ওই বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন: দুবাইয়ের বিলাসী জীবন থেকে পুলিশের জালে
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালতের এক আদেশের প্রেক্ষিতে বেনজীরের মালিকানাধীন সাভানা রিসোর্ট ও ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা এক আবেদনের প্রেক্ষিতে তার সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দিয়েছিল ঢাকার একটি আদালত।
২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আইজিপির পদ থেকে অবসরে গিয়েছিলেন বেনজীর। এর বছর দুয়েক পরে একটি পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাপক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করে রিপোর্ট প্রকাশ করলে তা নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে দেশ ছেড়ে দুবাই চলে যান তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই রেড নোটিশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ ওঠে। সেগুলো নিয়ে তদন্তে নামে দুদক। সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখনই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।
রোববার সাবেক আইজিপির গ্রেফতারের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করার পর দুদকের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং অপর একটি মামলার বিচার চলছে।
তিনি আরও বলেন, ‘জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। আর পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ আরও পাঁচটি মামলার তদন্ত চলছে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলাগুলোর কার্যক্রমে আরও গতি পায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই ২০২৫ সালে বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন পাঠানো হয়।
দুদক কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আবেদন করেছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা ইন্টারপোলে আবেদন করেছিলাম। তার প্রেক্ষিতে ইন্টারপোল সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করেছে।’
যেভাবে গ্রেফতার হন দুবাইয়ে
সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে যে ছয়টি মামলা ছিল, তার মধ্যে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জন এবং পাসপোর্ট জালিয়াতির দুটি মামলায় ইন্টারপোলের মাধ্যমে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।
দুদক জানিয়েছে, সাবেক আইজিপি সরকারি কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার না করে জালিয়াতি করে সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। এই মর্মে অভিযোগ ছিল এবং একাধিক পাসপোর্ট তিনি গ্রহণ করেছিলেন।
দুদক কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের যে পাঁচটি মামলা হয়েছিল সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে, সেখানে তার জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭৬ কোটি টাকারও ওপরে।
তিনি বলেন, এসব মামলায় বেনজীর আহমেদকে হাজির করতে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন করেছিলাম। পরে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে রেড নোটিশ জারি করতে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বা এনসিবি।
রোববার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। ওই রেড নোটিশের মাধ্যমে ইন্টারপোল সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গ্রেফতারের অনুরোধ জানায়।
আরও পড়ুন: বেনজীরের দেশ-বিদেশে যত অবৈধ সম্পদ
এসময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জানান, গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই থেকে মেইল পেয়ে তার গ্রেফতারের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয় বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ‘বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ সহ অন্যান্য ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বর্তমানে এনসিবি ঢাকা রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং গ্রেফতার পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।’
দেশে ফেরানো হবে কোন প্রক্রিয়ায়?
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর তাকে কবে ফেরানো হবে কিংবা ঠিক কী প্রক্রিয়ায় ফেরানো হবে- সেই বিষয়গুলো সামনে আসছে।
রোববার দুদকের পক্ষ থেকে যে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেও এই প্রশ্নটি এসেছিল সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে।
জবাবে দুদক কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বলেছেন, তাকে গ্রেফতারে দুদক ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, একই প্রক্রিয়ায় দেশে আনার পর পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও বিচার কাজ শেষ করা হবে।
বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে কি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদকের কাছেও হস্তান্তর করা হবে কি না- এমন প্রশ্নও উঠেছিল সংবাদ সম্মেলনে। তবে এ নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করেনি দুদক।
তবে কিভাবে সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, তার একটি প্রক্রিয়াগত ব্যাখ্যা জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেছেন, ‘গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই থেকে মেইল পেয়ে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়। এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, ইউএইএ ফেডারেল ল নাম্বার ৩৯ (২০০৬) অনুযায়ী গ্রেফতারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট (প্রত্যর্পণের আবেদন) পাঠাতে হবে।’
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮-সহ অন্যান্য ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এনসিবি ঢাকা রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং গ্রেফতার পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত করেছে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করে অতি দ্রুত কূটনৈতিক চ্যানেলে এনসিবি আবুধাবির কাছে পাঠানো হবে এবং তাকে দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলেও সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আলোচিত-সমালোচিত আইজিপি
পুলিশের শীর্ষ পদে থাকা অবস্থায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন বেনজীর আহমেদ। যদিও তিনি নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যার’ মত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সম্পৃক্ততার জন্য।
বেনজীর আহমেদ র্যাবের মহাপরিচালক থাকার সময় বহু বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু তিনি কখনোই বিচার ‘বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ টার্মটিকে গ্রহণ করতেন না। সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার নানা বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনাও তৈরি হয়েছিল।
র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন ২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি বলেছিলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একটি সস্তা প্রচারণা। একটি বিশেষ মহল এই প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধীরা অপরাধ করবে আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা চেয়ে চেয়ে দেখবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কি অস্ত্র দেওয়া হয়েছে হাডুডু খেলার জন্য?’
বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত চলচ্চিত্র অভিনেত্রীকে কেন্দ্র করে ঢাকার বোট ক্লাবে অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রকাশ হয় যে, ওই ক্লাবের সভাপতি তখনকার আইজিপি বেনজীর আহমেদ নিজেই।
২০২১ সালের জুনে ওই ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে এবং ওই ক্লাবের একজন সাবেক সভাপতি পরবর্তীতে আটক হন। তারও পরে জেলে যেতে হয় ওই চিত্রনায়িকাকেও।
কিন্তু ঢাকার আশুলিয়ায় বোট ক্লাবের ছবি ও এর সভাপতি হিসেবে বেনজীরের নাম আসার পর তা ঝড় তোলে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমে। এমনকি বিপুল অর্থ দিয়ে কীভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এই ধরনের ক্লাবের সদস্য হতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে জাতীয় সংসদেও।
বিশেষ করে একটি বাণিজ্যিক ক্লাবের সভাপতি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আইজিপি থাকতে পারেন কি না, সে প্রশ্নও উঠেছিল তখন।
২০১৩ সালে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসার সামনের সড়ক বন্ধ করে দিয়েছিল পুলিশ। তখন সেখানে রাস্তা আটকে রাখা হয়েছিল বালুর ট্রাক, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিএনপি নেতারা এ ঘটনার জন্য তখনকার ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের তীব্র সমালোচনাও করেছিলেন।
২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের যে অবরোধ কর্মসূচি ছিল, সে সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপির কমিশনার ছিলেন বেনজীর আহমেদ। হেফাজতে ইসলামীর বিশাল সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে তখন আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।
এএইচ