দেশের ইতিহাসে প্রভাবশালী আইজিপিদের শীর্ষে বেনজীর আহমেদের নাম। গোপালগঞ্জে বাড়ি এবং শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন-এমন পরিচয়ে তিনি পুলিশে অপ্রতিরোধ্য গতিতে পদোন্নতি পান। ডিএমপি কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক এবং সবশেষ আইজিপি হিসেবে ছিলেন ব্যাপক আলোচিত। ক্ষমতায় থাকাকালে অঢেল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেই অবসরে যান। তখনই অবৈধ সম্পদের খবর প্রকাশিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অভিজাত শহর আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তার বিলাসবহুল জীবনযাপনের খবর পাওয়া যাচ্ছিল নানা সূত্রে। দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি আটকা পড়লেন দুবাই পুলিশের জালে। রোববার (১৪ জুন) বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে তার গ্রেফতারের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও জানান এই খবর। সাবেক আইজিপিকে দ্রুত সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনার আশ্বাসও দেন মন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
যেভাবে পুলিশের জালে বেনজীর
রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ এবং ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে প্রেরিত এক ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে, বেনজীর আহমেদকে ইউএই পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানে আটক রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, ইউএই’র ফেডারেল আইন অনুযায়ী গ্রেফতারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) আবেদন পাঠাতে হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এর আওতায় একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
মন্ত্রী জানান, বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি), ঢাকা ইন্টারপোলের কাছে প্রয়োজনীয় আবেদন করেছিল। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে। রেড নোটিশের মাধ্যমে ইন্টারপোল সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে তাকে শনাক্ত ও গ্রেফতারের অনুরোধ জানায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এনসিবি ঢাকা ইতোমধ্যে ইন্টারপোল চ্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সমন্বয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন করবে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকুয়েস্ট পাঠানো হবে।
এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আবুধাবির সঙ্গে এনসিবির সমন্বয়ের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদকে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার পথে দেশ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। একইসঙ্গে জাতিকে আমরা আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
দোর্দণ্ড প্রতাপ থেকে অবৈধ সম্পদের পাহাড়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বেনজীর আহমেদ। এর আগে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম। তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ নভেম্বর বেনজীরের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন হাফিজুল ইসলাম।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, বেনজীর আহমেদ তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দেন। তবে তদন্তে তার নামে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮৭ টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার ২৬৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্তে মোট ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও বৈধ আয়ের উৎস হিসেবে পাওয়া গেছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। ব্যয় বাদ দিলে নিট সঞ্চয় দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। এ হিসাবে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকা।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, এসব অর্থের অবৈধ উৎস, প্রকৃতি ও মালিকানা গোপন করে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যৌথ মূলধনি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, স্থানান্তর ও রূপান্তর করেছেন বেনজীর আহমেদ।
গত ৩ মে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়। গত ৮ মার্চ মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সহকারী পুলিশ সুপার হিসাবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ সন্ত্রাস দমন বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য হিসেবে বসনিয়া ও কসোভোতে কাজ করেছেন।
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন বেনজীর আহমেদ। এর আগে তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দফতর। ওই তালিকায় র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে বেনজীর আহমেদের নামও আসে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন আইজিপির দায়িত্বে ছিলেন বেনজীর আহমেদ।
২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী তিনি অবসরে চলে যান। অবসরে যাওয়ার পর তার অনেক অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর আসে।
‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ ও ‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’ শিরোনামে দুই পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন (সাবেক আইজিপির অপকর্ম-১ ও ২) প্রকাশ করে জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ।
২০১৪ সালের ৩১ মার্চ প্রকাশিত প্রথম পর্বের মূল শিরোনাম ছিল ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেনজীরের পরিবারের মালিকানায় রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ইকো রিসোর্ট। এই রিসোর্টের পাশে আরও ৮০০ বিঘা জমি কিনেছে তার পরিবার। এ ছাড়া পাঁচ তারকা হোটেলের ২ লাখ শেয়ারও রয়েছে তাদের। ঢাকার বসুন্ধরায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটও রয়েছে বেনজীরের পরিবারের। এসব সম্পত্তি অবৈধ টাকায় কেনা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
‘সাবেক আইজিপির অপকর্ম-২’ প্রকাশ করা হয় ওই বছরের ২ এপ্রিল। এই পর্বের মূল শিরোনাম ছিল ‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজীপুর সদরের ভাওয়াল গড় ইউনিয়নের নলজানী গ্রামে ১৬০ বিঘা জমির ওপর ভাওয়াল রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এই রিসোর্ট করতে বনের ২০ বিঘা জমি দখল করা হয়েছে। এই রিসোর্টের ২৫ শতাংশের মালিকানা বেনজীর আহমেদের পরিবারের। এ ছাড়া দুবাইয়ে শতকোটি টাকার হোটেল ব্যবসা, সিঙ্গাপুরে সোনার ব্যবসা এবং থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় তার পরিবারের জমি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কালের কণ্ঠ-এর প্রতিবেদনের পর ২০ এপ্রিল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন বেনজীর আহমেদ। ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, তার পরিবারের যে সম্পদ রয়েছে, তা বৈধ এবং এর হিসাব ট্যাক্স ফাইলে উল্লেখ রয়েছে। অবৈধ যেসব সম্পত্তির কথা বলা হচ্ছে, তা কেউ প্রমাণ করতে পারলে ওই ব্যক্তি বা গ্রুপকে সেই সম্পত্তি তিনি বিনা পয়সায় লিখে দেবেন বলেও ভিডিওতে দাবি করেন।
বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসার পর দেশজুড়ে আলোচনার মধ্যে ২০২৪ সালের মে মাসে তার দেশ ছেড়ে যাওয়ার খবর আসে। এর দুই বছরের বেশি সময় পর দুবাই থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
কে এই বেনজীর আহমেদ
১৯৬৩ সালের ১ অক্টোবর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তার জন্ম। শিক্ষাজীবনে বেনজীর আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া প্যাসিফিক সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্ট্যাডিজ, অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা চার্লস স্ট্রার্ট ইউনিভার্সিটি ও সিঙ্গাপুরের বিশ্বব্যাংক আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পড়াশোনা করেন।
সপ্তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ ১৯৮৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে।
ছয় বছর র্যাবের ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে প্রায় সাড়ে চার বছর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ছিলেন।
এছাড়া তিনি কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার, ডিএমপিতে ডিসি নর্থ, পুলিশ একাডেমির প্রধান প্রশিক্ষক, পুলিশ সদর দফতরের এআইজি, পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার টাঙ্গাইলের কমান্ড্যান্ট, ডিআইজি (প্রশাসন ও অপারেশনস্) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বিভাগে চিফ অব মিশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট সার্ভিসেস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দফতরে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।
জেবি




