বোরহান উদ্দিন
২৫ মে ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম
গাইবান্ধার ফুলছড়ি থেকে আমজাদ হোসেনসহ ছয়জন মিলে ২০টি গরু নিয়ে এসেছেন পুরান ঢাকার ধোলাইখাল পশুর হাটে। ভালো দাম পেতে পারেন সেই আশায় গত শুক্রবার রাতে প্রথমবারের মতো এই হাটে আসেন তারা।
রোববার (২৪ মে) বিকেলের দিকে মুষলধারে বৃষ্টির পর রাতে আমজাদ হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত মাঝারি আকারের দুটি গরু বিক্রি হয়েছে। আশা ছিল আরও বেশি হবে। কম বিক্রির কারণ হিসেবে তার ভাষ্য, বৃষ্টির কারণে ক্রেতারা বাজারে কম আসছেন। এছাড়া আগেভাগে গরু কিনলে ঢাকায় রাখার সমস্যাও আছে।
এই গরু বিক্রেতা আরও জানান, কয়েক দিন টানা গরমের কারণে গরু অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। দিনে একাধিবার পানি দিয়ে শরীর ভিজিয়ে দিতে হয়েছে। বৃষ্টি হওয়ায় গরু সুস্থ থাকবে। কিন্তু বিক্রির ওপর বেশ প্রভাব পড়বে। কাঙ্ক্ষিত দাম নাও পেতে পারেন।

এমন আশঙ্কা শুধু গাইবান্ধা থেকে আসা এই বিক্রেতার নয়, রাজধানীর হাটগুলোতে আসা বেশির ভাগ বিক্রেতার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস।
সোমবার (২৫ মে) বেলা ১২টার পর থেকে টানা এক ঘণ্টার বেশি বৃষ্টি হয়েছে ঢাকায়। এতে ঢাকার হাটগুলোর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ঈদ পর্যন্ত থেমে থেমে এমনটা চললে বিক্রেতাদের চিন্তা আরও বাড়বে। অন্যদিকে আবহওয়া অধিদফতর কালবৈশাখী ঝড়ের শঙ্কার কথাও জানিয়েছে। যা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এবার রাজধানীতে অস্থায়ী পশুর হাট বসেছে ২১টি। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১১টি আর ঢাকা দক্ষিণে ১০টি। এবারের হাটগুলোর বেশির ভাগ ইজারা পেয়েছেন বিএনপির লোকজন। অবশ্য জামায়াত ও এনসিপির ঘনিষ্ঠ লোকজনও হাট ইজারা পেয়েছেন। ইজারাদারদের পক্ষ থেকে হাটে বাঁশের খুটি বসানোসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকলেও বৃষ্টির কারণে হাটে পানি জমে গেলে দ্রুত তা অপসারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই অবস্থা সব হাটের। পানির সঙ্গে গোবর, ফেলে দেওয়া খড়কুটো বৃষ্টিতে ভিজে হাটে স্বাভাবিক চলার মতো পরিস্থিতিই থাকছে না।
ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকার কোরবানির পশুর হাটগুলোতে রোববার থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণা বেড়েছে। তবে বিক্রির ধুম লাগার আগেই বাগড়া দিয়েছে প্রকৃতি।
রাজধানীর ধোলাইখাল হাটে গিয়ে দেখা যায়, উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত বিক্রেতা তাদের লালন-পালন করা গরু নিয়ে এসেছেন। গত কয়েক দিনের তীব্র গরমে পশুপাখি অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় ছিল সবার মধ্যে। সেই দিক থেকে রোব ও সোমবারের বৃষ্টি বিক্রেতাদের মনে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি এখন চরম উৎকণ্ঠায় রূপ নিয়েছে।
রাজধানীর কাজলা, হাজারীবাগ হাট ঘুরেও বৃষ্টির কারণে সমস্যায় পড়তে দেখা গেছে বিক্রেতাদের। কিছু কিছু হাটে অনেক বৃষ্টি হওয়ায় পানি জমে গেছে। বিশেষ করে হাজারীবাগের হাটে বৃষ্টির কারণে পানি এবং রাস্তায় তীব্র যানজটের কারণে অনেকে হাটেই ঢুকতে পারছেন না বলে জানা গেছে।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ কালবৈশাখী ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। নদী বন্দরগুলোকে সতর্ক সংকেতও দেখাতে বলা হয়েছে। আবহাওয়ার এই বৈরী পূর্বাভাসই মূলত ঘুম কেড়ে নিয়েছে ব্যাপারিদের।
বিক্রেতারা জানান, বৃষ্টি বাড়লে হাটের নিচু এলাকাগুলোতে পানি ও কাদা জমে একাকার হয়ে যাবে। এতে হাটের পরিবেশ যেমন নষ্ট হবে, তেমনি দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারাও হাটে আসার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হারাবেন। কাদা-পানিতে গরু টানাটানি করা এবং তাদের সুস্থ রাখা বিক্রেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
কুষ্টিয়া থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী রহমত আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘কয়েক দিনের গরমে গরুগুলো হাঁসফাঁস করছিল, বৃষ্টি হওয়ায় শরীরটা ঠান্ডা হইছে। কিন্তু এখন যদি ঝড়-তুফান শুরু হয়, তবে ত্রিপল খাটিয়েও গরু বাঁচানো যাবে না। কাদার মধ্যে লোকজন ঢুকতে চাইবে না। তখন বাধ্য হয়ে কম দামে গরু ছেড়ে দিতে হবে।’
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ক্রেতার সমাগম কমে গেলে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাবে না। একদিকে হাটের নোংরা পরিবেশ, অন্যদিকে পশুর যত্ন নেওয়ার বাড়তি খরচ- সব মিলিয়ে এক বুক আশা নিয়ে ঢাকায় আসা খামারি ও বিক্রেতারা এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন গুনছেন।
ঝিনাইদহ থেকে দুটি বড় আকারের গরু নিয়ে ধোলাইখাল হাটে আসা খামারি খলিল মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গরমে গরুর অবস্থা কাহিল হয়ে পড়েছিল। বৃষ্টি হওয়ার পর কিছুটা ভালো আছে। কিন্তু এখন যদি ঝড়-তুফান শুরু হয়, তাইলে তো বিপদে পড়ে যাবো।’
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, আবহাওয়া খারাপ থাকলে ক্রেতারা হাটে আসার আগ্রহ হারাবেন। বাজারে ক্রেতা কম থাকলে শেষ মুহূর্তে লোকসান দিয়েও গরু ছেড়ে দিতে হবে।
বিইউ/জেবি