images

জাতীয়

শ্রমবাজারে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ চান বেশির ভাগ তরুণ

মহিউদ্দিন রাব্বানি

১৬ মে ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

  • ৪৮% কর্মক্ষম মানুষের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন
  • কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নেন মাত্র ১৬%
  • অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রশিক্ষণ সুযোগ কম
  • বাড়ছে সফট স্কিল শেখার চাহিদাও
  • এআই বদলে দিচ্ছে শ্রমবাজারের চিত্র

প্রযুক্তিনির্ভর নতুন শ্রমবাজারে টিকে থাকতে দক্ষতা উন্নয়নের দিকে ঝুঁকছেন দেশের তরুণরা। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ নতুন কারিগরি দক্ষতা শেখার জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী।

সম্প্রতি প্রকাশিত আইএলওর ‘লাইফলং লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ফর দ্য ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। কর্মী জরিপ, অনলাইন চাকরির বাজার বিশ্লেষণ, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং ১৭৪টি গবেষণার পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, সবুজ অর্থনীতি এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে কাজের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। ফলে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি নতুন দক্ষতা অর্জন এখন চাকরির বাজারে টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইএলওর জরিপে অংশ নেওয়া বাংলাদেশিদের প্রায় অর্ধেকই জানিয়েছেন, তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নতুন কারিগরি দক্ষতা শেখার জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ। সামগ্রিকভাবে এই চাহিদা ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও তরুণদের মধ্যে তা আরও বেশি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এ হার ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

আরও পড়ুন

দক্ষতা না থাকায় বিশ্ববাজারে পিছিয়ে বাংলাদেশি কর্মীরা

ডিজিটাল ও কম্পিউটার দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও তরুণদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণদের ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ নিতে চান। অথচ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই হার ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে চাকরির বাজারে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল জ্ঞানের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি চাকরি থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা কার্যক্রম কিংবা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার— সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত দক্ষতার চাহিদা বাড়ায় তরুণদের মধ্যে এ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

maloysia
বিশ্ববাজারে বাড়ছে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, শুধু কারিগরি প্রশিক্ষণ নয়, ব্যক্তিগত ও মানসিক দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। মোট ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও সফট স্কিলভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন বলে মনে করেন। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই হার ৩২ শতাংশ এবং প্রবীণদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ।

এছাড়া ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন অনুভব করছেন ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ। যোগাযোগ দক্ষতা, সহযোগিতা ও দলগত কাজ শেখার প্রশিক্ষণের চাহিদা রয়েছে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতার মধ্যে। অন্যদিকে সৃজনশীলতা, কৌশলগত চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধান দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের চাহিদা তুলনামূলক কম হলেও তরুণদের মধ্যে এ আগ্রহ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনো প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা তুলনামূলক বেশি প্রশিক্ষণ পেলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের বড় অংশ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ গত এক বছরে কোনো কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক খাতে স্থায়ী পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ কোনো না কোনো প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের ক্ষেত্রে সেই হার অনেক কম। ফলে নিম্নআয়ের ও কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ছে।

মাধ্যমিক শিক্ষাসম্পন্ন কর্মক্ষম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ কোনো ধরনের শেখার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা নেই এমন মানুষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এতে শ্রমবাজারে দক্ষতার বৈষম্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছে আইএলও।

আরও পড়ুন

শ্রমবাজারে বড় বৈষম্যের শিকার নারীরা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে অনেক শ্রমিক কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করলেও ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য হয়ে উঠবে।

আইএলওর মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হংবো বলেন, জীবনব্যাপী শিক্ষা বর্তমান কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে। এটি শুধু চাকরির সুযোগ বাড়ায় না, বরং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Skil
চাকরির বাজারে এগিয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, বর্তমান শ্রমবাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, মানসিক সক্ষমতা ও অভিযোজন ক্ষমতার মতো সফট স্কিলের গুরুত্বও বাড়ছে। এজন্য সরকার, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটি সুপারিশও করেছে আইএলও। এর মধ্যে রয়েছে জীবনব্যাপী শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা, প্রশিক্ষণে আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মভিত্তিক শিক্ষা ও শিক্ষানবিশ কার্যক্রম জোরদার করা এবং শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা।

আরও পড়ুন

দেশে চাকরির বাজারে বৈষম্য নিয়ে গবেষণার ফলাফলে যা পাওয়া গেল

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নারী, বয়স্ক কর্মী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য ও নমনীয় প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিভাজন কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বড় তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। অন্যদিকে দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ না বাড়ালে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, অদক্ষ শ্রমিকরা বিদেশের শ্রমবাজারে প্রায়ই অধিকারবঞ্চিত হন এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, বিশ্ববাজারে দক্ষ ও পেশাদার শ্রমিকদের চাহিদা সবসময় থাকে। এজন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে বৈশ্বিক চাহিদাসম্পন্ন জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

এমআর/জেবি