- সরকারের প্রশিক্ষণের ১১০টি ট্রেনিং রয়েছে
- প্রশিক্ষণ নিতে অনীহা বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের
- এজেন্সিগুলো সমন্বয় করে না বিএমইটির সঙ্গে
- অনেকে প্রশিক্ষণ নিলেও বিদেশ যেতে পারছেন না
নীলফামারীর নাজমুল ইসলাম সাত বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি জিমে কাজ করলেও অন্য কোনো কাজ শেখার সুযোগ পাননি। কারণ, তার কোনো পেশাগত দক্ষতা ছিল না। যে ভিসায় তিনি গিয়েছিলেন, তার বাইরে কাজ করারও সুযোগ ছিল না। ছয় মাস আগে মালিক তাকে দেশে ফেরত পাঠান। এখন তিনি বেকার।
বিজ্ঞাপন
নাজমুল বলেন, যদি আগে থেকে দক্ষ হয়ে সৌদি আরব যেতাম, তাহলে ভালো বেতন পেতাম। এভাবে অপমানিত হয়ে দেশে ফিরতে হতো না।
অন্যদিকে নীলফামারীরই সবুজ সরকার ১৮ বছর আগে মালয়েশিয়ায় যান। যাওয়ার আগে রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি ট্রেনিং সেন্টার থেকে তিনি গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। ছয় মাস প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন কোম্পানির গাড়ি চালান। পরবর্তীতে একটি গাড়ি কিনে ব্যবসায় যুক্ত হন। প্রতি বছরই তিনি চুক্তি নবায়ন করেন।
সবুজ ঢাকা মেইলকে বলেন, ড্রাইভিং না শিখে আসলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশে ফিরতে হতো। তাই যারা বিদেশে যেতে চান, তাদের আগে দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দিই।
নাজমুল ও সবুজের এই দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয় দক্ষতা ও অদক্ষতার পার্থক্য। একজন দক্ষ হয়ে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, অন্যজন দেশে ফিরে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
প্রতি বছরই পর্যাপ্ত দক্ষতা ছাড়াই বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকরা কম বেতনে কাজ করছেন। চুক্তির মেয়াদ শেষে অনেকে দেশে ফিরে আবারও বেকার হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ সামান্য সঞ্চয় দিয়ে ছোট ব্যবসা শুরু করলেও সেই সংখ্যা খুবই কম।
প্রতি বছর হাজার হাজার শ্রমিক দক্ষতা না থাকায় মালয়েশিয়া ও সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসছেন। বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব হলেও গত এক দশকে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর হার খুবই কম। ফলে নির্মাণ, শ্রমিক, ক্লিনার ও গৃহকর্মী হিসেবেই বেশি শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশিক্ষণ ছাড়া যাওয়া অনেক গৃহকর্মী বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকারও হচ্ছেন।
প্রশিক্ষিত কর্মী নিতে এজেন্সিগুলোর অনীহা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশে বিএমইটির ১১০টি ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রতি বছর দেড় লাখের মতো লোক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। কিন্তু সেসব লোককে বাছাই করছে না এজেন্সিগুলো। তারা নিজেদের মতো করে মাঠ পর্যায় থেকে লোকজন সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাচ্ছে। এতে বিএমইটি ও এজেন্সির মধ্যে একটি বড় সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। নিয়ম হলো, এজেন্সিগুলো বিএমইটির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকদের বাছাই করে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে, কিন্তু তারা তা করছে না। এটা বহু বছর ধরে চলে আসছে। এর ফলেও বিদেশে কাঙ্ক্ষিত বেতন পেতে বাংলাদেশি কর্মীদের বেগ পেতে হচ্ছে।
দক্ষ হতেও অনীহা অনেকের
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির একাধিক কর্মকর্তা জানান, যারা বিদেশে কাজের জন্য যাচ্ছেন তারা চান রাতারাতি ভিসা হোক, টিকিট নিয়ে তারা উড়াল দেবেন। তারা কোনো দক্ষতা নিয়ে যেতে চান না। ফলে তাদের ট্রেনিংয়ে আগ্রহী করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। যদিও এজেন্সিগুলোর ট্রেনিং সেন্টার থাকার কথা এবং তারাই বিদেশে পাঠানো শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেবে। তা অধিকাংশ এজেন্সি করছে না। তবে কারও না থাকলে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে সেখানে লোকজনকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাতে পারেন।
সরকারের উদ্যোগ কম
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশে বিএমইটির যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো রয়েছে, সেগুলোতে ভালো ট্রেনার নেই। আছে নানা সীমাবদ্ধতা। তাছাড়া যারা ট্রেনিং নিচ্ছেন তাদের অনেকেই এখনো বিদেশ যেতে পারেননি। যদিও নিয়ম অনুযায়ী এজেন্সিগুলো তাদের বাছাই করে নিয়ে যাবে, কিন্তু বিএমইটিও এজেন্সিগুলোকে কোনো চাপ দেয় না।
বিএমইটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এজেন্সিগুলোর তো দায়িত্ব প্রশিক্ষিত লোকজন পাঠানো। এজন্য তাদের বিএমইটি সহায়তাও করতে চায়। কিন্তু তারা তা করছে না। আবার বিএমইটি তাদের প্রশিক্ষিত লোকজন নিতে এজেন্সিগুলোকেও কোনো চাপ দেয় না। ফলে এভাবেই চলছে। যদি কোনো এজেন্সি নিতে অনীহা প্রকাশ করে, তৎক্ষণাৎ তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে—এমন নিয়ম চালু করলে সবাই বাধ্য থাকবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের বাছাই করতে।
দূতাবাসগুলোর অসহযোগিতা
এজেন্সিগুলোর একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, তারা তাদের লবিং দিয়ে ভিসা ও কাজের চুক্তিপত্র নিয়ে আসেন। কিন্তু এ কাজে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো তেমন সহায়তা করে না। ফলে তারা কাঙ্ক্ষিত কাজের ভিসাও পান না।
এ বিষয়ে বিএমইটি যা জানাল
প্রবাসে কাজে যাওয়া আমাদের কর্মীরা অন্য দেশের কর্মীদের তুলনায় কম বেতন পান—এটি স্বীকার করে বিএমইটির মহাপরিচালক আবুল হাছনাত হুমায়ুন কবির ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের সারাদেশে ১১০টি ট্রেনিং সেন্টার আছে। গত বছর আমরা ১ লাখ ৬৭ হাজার ব্যক্তিকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এবার তা দুই লাখ করার টার্গেট রয়েছে। আসলে এই ক্যাপাসিটি তো রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। আপনি যদি ১০ বছর পেছনে যান, তাহলে দেখতে পাবেন আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো দেশে যাওয়ার জন্য স্কিল সার্টিফিকেট ছাড়াও যাওয়ার সুযোগ নেই। যারা যাচ্ছেন তারা প্রশিক্ষিত হয়েই যাচ্ছেন। তবে আমরা যেসব বিষয়ে ট্রেনিং দিচ্ছি, সেগুলোর বাইরে আরও কীভাবে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তা নিয়ে ভাবছি।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপের মার্কেট ধরার জন্য কাজ করছে, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ লোকজন যেতে পারে। এজন্য ইতোমধ্যে ছাত্রছাত্রী হিসেবে যারা বিদেশে যাবেন, তাদের জন্য ১০ লাখ টাকার ব্যাংক ঋণ সহজ করেছে সরকার।
প্রবাসী অভিবাসন নিয়ে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
প্রবাসী শ্রমিক ও তাদের অধিকার দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখির পাশাপাশি সরসারি এ কাজে যুক্ত শরীফুল হাসান। তিনি এখন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্লাটফর্মের সহযোগী পরিচালক।
তিনি ঢাকা মেইলকে প্রবাসীদের দক্ষতা ও কাজ করেও সঠিক মূল্যায়ন না পাওয়া নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, তাদের সুরক্ষার অভাব আছে এর একটা বড় কারণ তো নিশ্চয়ই যে তারা স্কিল না। তার পাশাপাশি হচ্ছে পুরো অভিভাবসন প্রক্রিয়ার মধ্যে স্বত্বভোগী নির্ভর অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের যথেষ্ট ঘাটতি আসলে রয়ে গেছে। আমরা জাতিগতভাবে যেকোনো মূল্যে নিজেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য যেই আমাদের চেষ্টা থাকে বা সব আমলেই দেখবেন সব সরকারের আমলেই তাদের লক্ষ্য থাকে কত লাখ লোককে বিদেশে পাঠানো গেল। কিন্তু যারা গেল তাদের অধিকার কতটা সুরক্ষা হলো বা আসলে যে পরিমাণ মানুষ গেল সেই তুলনায় রেমিটেন্স বেড়েছে কি কমেছে কিনা আদৌ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়ে দেশে লাভ হয় কিনা সেই বিষয়গুলো কিন্তু বিবেচনায় ধরা হয় না। তার ফলে দেখা যায় সৌদি আরবে আমাদের ২০ থেকে ২৫ লাখ কর্মী নতুন করে যাচ্ছে। কিন্তু রেমিটেন্স পাঁচ বছর আগে যেখানে ছিল তার চেয়ে কমছে। আবার কর্মীরা কাজ না পেয়ে ফেরত আসে। তাদের অধিকার সুরক্ষা নেই। এই সংকটগুলো সমাধানের জন্য আসলে এখানে যে যাচ্ছে, যে নিচ্ছে, যে পাঠাচ্ছে এই তিন শ্রেণির সাথেই যে রেগুলেটরি অথরিটি ও আমাদের সরকার আছে। সরকারসহ সমস্ত কিছু রেগুলেটরি অথরিটিগুলোকে বলব যে তাদের আসলে দায়িত্ব হলো প্রতিটি প্রবাসী কর্মীর যে অধিকার আছে তার সুরক্ষা করা। তার ঠিকমত কাজে যাওয়া, তার বেতন পাওয়া, তার রিক্রুটমেন্ট ফেয়ার করা প্রসেসটাকে মানে মানবিক করা। এই কোনটাই আমরা করতে পারি নাই বলে দেখা যায় যে আমাদের প্রবাসী কর্মীরা বিদেশে বিপদে পড়ে মারা যায়, লাশ হয়ে ফেরে আবার যে প্রবাসী একবার যায় তার ২০-২৫ বছর বিদেশে থেকেই যায়।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে পরিবারকে টাকা পাঠিয়ে দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠিয়েও শেষ বয়সে এসে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের কাছে ঠাই মিলছে না। এসবকে নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। তার আগে তারা যে মানুষ এবং প্রবাসীদের মূল্যায়ন করতে হবে। মে দিবসকে কেন্দ্র করে যদি আমরা আসলেই চাই যে প্রবাসী কর্মীদের ভালো থাকবে, তাদের একটা মর্যাদাপূর্ণ জীবন হবে তাহলে এই মাইগ্রেশন কস্ট কমানোর জন্য মানসম্মত কর্মী পাঠানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। আপনি কত লাখ কর্মী পাঠালেন সেটা কিন্তু তার আগে দেখতে হবে কেমন ধরনের কর্মী পাঠালেন। তারা সেখানে গিয়ে বার্গেইন করতে পারে কিনা? তারা চাইলেই অন্য জায়গায় কাজ করে চলে যেতে পারে কিনা সেই বিষয়গুলো দেখে আমাদের নজর দেয়া উচিত।
বায়রার সাবেক মহাসচিব হায়দার আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের যে চাহিদা আমরা সেই অনুপাতে দক্ষ লোক পাঠাতে পারি না। তবে আমরা দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর চেষ্টা করছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাহিদা নিয়ে আসি। তবে তার আগে কাগজপত্র প্রসেসিং করার জন্য সেই দেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাস সংশ্লিষ্টদের অনুমোদন লাগে। কিন্তু এসব করতে দেরি হয়ে যায়। ফলে এশিয়ার অন্য দেশগুলো চাহিদাপত্র আনার পর এক সপ্তাহের মধ্যে লোক পাঠাতে পারলেও আমাদের দুই মাস লেগে যায়। আমরা দেরিতে অনুমোদন পাওয়াসহ নানা প্রসেসিংয়ের কারণে সেটা সম্ভব হয় না।
তবে তিনি মনে করেন বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর জন্য এজেন্সি, মন্ত্রণালয় ও বিএমইটি সকলকে সমন্বয় করতে হবে। তাহলেই বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানো সম্ভব হবে।
এমআইকে/এআর




