মোস্তফা ইমরুল কায়েস
৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১০ পিএম
* এক বছরে দুজন খুন
* টিটন হত্যায় গরুর হাটের দ্বন্দ্ব: দাবি ডিবির
* অপরাধজগৎ আবারও উত্তপ্ত
চাঁদা না দিলে সন্ত্রাসীদের হাতে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ খুনের ঘটনা পুরনো। কিন্তু এখন সন্ত্রাসীদের হাতে সন্ত্রাসীরাই মরছে। হত্যাকারীরা যে নিহতদের প্রতিপক্ষ, সেই প্রমাণও মিলছে। গত দুই বছরে খোদ ঢাকাতেই কয়েকটি ঘটনা আলোড়ন তুলেছে। রাজধানীর আধিপত্য ধরে রাখতেই সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন দল বিবাদে জড়াচ্ছে। শেষ পর্যন্ত একে অন্যকে হত্যা করছে। এসব ঘটনায় পুরনো সন্ত্রাসী দলের সদস্যদের নামই বারবার উঠে আসছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজধানীতে বিভিন্ন সহিংসতা ঘিরে পুরনো সন্ত্রাসীদের নাম উঠে আসছে। এদের মধ্যে রয়েছে— ‘পিচ্চি হেলাল’, ‘কিলার আব্বাস’, ‘সুইডেন আসলাম’, ‘রাসু’ ওরফে ‘ফ্রিডম রাসু’, ‘মফিজুর রহমান মামুন’সহ অনেকে। তাদের গড়া বিভিন্ন সন্ত্রাসীদল ঢাকার অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয় হচ্ছে। সম্প্রতি টিটন হত্যাকাণ্ডে শীর্ষসন্ত্রাসী ইমনের সঙ্গে দ্বন্দের বিষয় উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খাতায়। টিটন হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে পুরো অপরাধজগতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যা গোয়েন্দাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
সন্ত্রাসীর হাতেই সন্ত্রাসী মরছে
রাজধানীর পল্লবীতে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দুই সন্ত্রাসী দলের দ্বন্দ্বে খুন হন ‘ব্লেড বাবু’ নামে এক সন্ত্রাসী। সেদিন বিকেলে টেকেরবাড়ি এলাকায় তার প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে একা পেয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় বাবু নিহত হওয়ার পাশাপাশি রমজান নামে একজন আহত হন। বাবু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সন্ত্রাসী মুসা সিকদার ওরফে সুমন সিকদার ও তার লোকজন সরাসরি জড়িত ছিল বলে পরে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।
এছাড়াও গত বছরের ১০ জুন পল্লবী এলাকাতেই রাকিবুল হাসান সানি ওরফে ‘পেপার সানি’ নামে এক সন্ত্রাসী প্রতিপক্ষের হাতে নৃসংশভাবে খুন হয়। তাকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে পল্লবী মিল্লাত ক্যাম্পের ১১ নম্বর সেকশন থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মাদক কারবার ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই তাকে খুন করা হয়। তারও আগে একই সন্ত্রাসীদলের ফয়সাল নামে এক সদস্য একই চক্রের হাতে নিহত হয়।
চলতি বছরের শুরুর দিকে অর্থাৎ গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজতুরি বাজার এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির নিহত হন এবং সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ নামে আরেকজন আহত হন। যদিও এই ঘটনায় পরে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশনা বিদেশ থেকেই এসেছিল বলে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে। তবে এ তথ্য স্বীকার করেনি পুলিশ প্রশাসন।
তার আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাজধানীর তেজগাঁও সড়কে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা যান আইনজীবী ভূবন চন্দ্র শীল। সেদিন মূলত শীর্ষসন্ত্রাসী ইমনকে হত্যার জন্য আরেক শীর্ষসন্ত্রাসী মামুনের লোকজন গুলি করে। দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে গুলিতে মারা যান ভূবন।
পরে ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুনের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। সেই দ্বন্দের জেরে মামুনকে হত্যার জন্যই সেদিন ইমনের লোকজন হামলা চালায়। তবে সেদিনের হামলার ধরনও সম্প্রতি নিউমার্কেটের ঘটনার মতোই ছিল। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার সিটি পেট্রোল পাম্প ও বিজি প্রেসের মাঝামাঝি প্রধান সড়কে একটি মাইক্রোবাস যাওয়ার সময় হঠাৎ গাড়িটিকে ঘিরে ধরে চারটি মোটরসাইকেল।
এরপর সেই গাড়িকে লক্ষ্য করে মোটরসাইকেলে থাকা ব্যক্তিরা এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। এসময় মাইক্রোবাস থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর সময় তারিক সাঈদ মামুনকে ঘিরে ধরে মোটরসাইকেলে থাকা ব্যক্তিরা। তাকে চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকেন। পরে জানা যায়, সেই মামুন হলেন সন্ত্রাসীদের একজন। এই মামুন একসময়ের শীর্ষসন্ত্রাসী। চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় ২৬ বছর কারাবন্দি থেকে সেই বছর তিনি বের হন। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা ধারণা করছিলেন, কারাবন্দি শীর্ষসন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে মামুনকে হত্যাচেষ্টা হতে পারে।
এদিকে অপরাধজগতের সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ইমন দেশ থেকে পালিয়েছে। প্রথমে মালয়েশিয়া এবং পরে দুবাই চলে যায়। নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যই দেশ ছাড়ে ইমন। না হলে ইমনকেও কোনো না কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে জীবন দিতে হতো।
নতুন আলোচনা তৈরি করেছে টিটন হত্যা:
এদিকে গত মঙ্গলবারের ঘটনায় নিহত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। জোট সরকারের সময়ে ২০০১ সালে ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় এই টিটনের নামও ছিল। ঢাকার মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, নিউমার্কেট, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, সূত্রাপুর ও গেন্ডারিয়াসহ পুরো পুরান ঢাকার অপরাধজগতের একটি বড় অংশ ইমন নিয়ন্ত্রণ করতেন। টিটন ও ইমন গত ৫ আগস্টের পর জেলে থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসে। তবে ইমন বিদেশে চলে যান। তার সঙ্গে সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমনের দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছিল। তবে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের হাত থাকতে পারে বলে ধারণা করছে তার পরিবার।
টিটন হত্যার ঘটনায় রাজধানীর নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে এ মামলা করেন। মামলায় আট-নয়জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে, তারা সিসি ক্যামেরার সূত্র ধরে গুলি করে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খুঁজছেন।
নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় আট-নয়জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এদিকে টিটন হত্যার নেপথ্যে দুটি কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিদেশে থাকা ইমনের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা ও এলাকার আধিপত্য নিয়ে বিরোধ এছাড়াও পুরোনো হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে টিটনকে হত্যা করা হলো কি না তাও তদন্ত করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
পুরনো সন্ত্রাসীরা ফের সক্রিয়:
২৬ বছর আগে ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করেন চারদলীয় জোট। সেই ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর বেশির ভাগই ক্লিনহার্ট অপারেশন শুরু হলে তারা কেউ দেশ ছাড়েন, কেউ কেউ ক্রসফায়ারে নিহত হন। আবারও বিএনপি সরকার ফেরত আসায় সেই সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ আবারও সক্রিয় হচ্ছন। আবারও আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ওঠেপড়ে লেগেছেন।
তবে টিটন হত্যায় ডিবির প্রধান ও ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, টিটন নিজেও একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিল। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে। আমরা এই ঘটনায় কারা জড়িত সেই বিষয়ে তদন্ত করছি। খোঁজ খবর নিচ্ছি, যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গেল বছরের এপ্রিল মাসের এক সন্ধ্যায় রাজধানীর এ্যালিফ্যান্ট রোডে মাল্টিপ্লান সেন্টারের পাকিংয়ের সামনের সড়কে প্রকাশে দুই কম্পিউটার ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটে। পরে সেই ঘটনায় জানা যায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের সঙ্গে তাদের মাল্টিপ্লানের ব্যবসা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। ইমনের লোকজন সেই হামলায় অংশ নেয়।
এছাড়াও ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। এর আগে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই টিপু হত্যা মামলারও আসামি ছিল মামুন। হত্যার দিন মামুন একটি মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। ঘাতকরা আগে থেকেই তার গতিবিধি অনুসরণ করছিল এবং সুযোগ বুঝে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে তাকে লক্ষ্য করে সাতটি গুলি চালায়।
আলোচিত মামুন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পরে জানা যায়, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও তার বাহিনী জড়িত। নিহত মামুন একসময় ইমনের সহযোগী ছিলেন। পরে তাদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মামুনের পরিবারের অভিযোগ, ইমনের অনুসারীরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আর মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উঠে আসে আরেক সন্ত্রাসী রনির নাম। রনি মিরপুরের কাফরুল এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী। মূলত তার পরিকল্পনা ও দেয়া অর্থেই মামুনকে হত্যা করা হয়। সন্ত্রাসী ইমন মনে করেছিল, মামুনকে সরিয়ে দিলে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
আলোচিত এই ঘটনায় ফারুক ওরফে ‘কুত্তা ফারুক’ ও রবিন নামে দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা দুজনই পেশাদুর শ্যুটার বলে জানিয়েছে পুলিশ। তারা দুই লাখ টাকার চুক্তিতে মামুনকে গুলি করে হত্যা করে। তবে তাদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করেছিল সন্ত্রাসী রনি। সেই রনি এখন পলাতক।
এমআইকে/ক.ম