বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন: যশোর থেকে যেভাবে রাজধানীর অপরাধ সাম্রাজ্যে

জেলা প্রতিনিধি, যশোর
প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৩ পিএম

শেয়ার করুন:

শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন: যশোর থেকে যেভাবে রাজধানীর অপরাধ সাম্রাজ্যে
নাইমুর হাসান টিটন (ফাইল ছবি)

ঢাকার ব্যস্ততম এলাকায় গুলিতে নিহত তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইমুর হাসান টিটনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে তার অতীত, পারিবারিক পটভূমি এবং বিস্তৃত অপরাধ সাম্রাজ্য। 

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন টিটন। ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে, যেখানে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে। 


বিজ্ঞাপন


যশোরের খড়কি থেকে অপরাধ জগতে উত্থান
টিটনের পৈত্রিক বাড়ি যশোর শহরের খড়কি এলাকায়, স্থানীয়ভাবে ‘আপন মোড়’ নামে পরিচিত স্থানে। সাত ভাই ও পাঁচ বোনের বড় পরিবারে জন্ম নেওয়া টিটন অল্প বয়সেই অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। তার ভাই টুটুলও একই পথে হাঁটেন।

স্থানীয়দের দাবি, তাদের অপরাধজগতে প্রবেশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের, যিনি টিটনের ভগ্নিপতি। 


বিজ্ঞাপন


খুন, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে টিটন ও টুটুল যশোরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তারা। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালা এলাকায় মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিএনপি কর্মী মোসলেম উদ্দিন খোকন ও টিপুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

ঢাকায় বিস্তার অপরাধ ও প্রভাব
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দুই ভাই ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে বড় অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। টিটন ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হন। ২০২১ সালে প্রকাশিত ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় টিটনের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। একই তালিকায় তার ভগ্নিপতি ইমনের নামও ছিল। 

1000252000
টিটনের মৃত্যুর খবরে যশোরে তার গ্রামের বাড়িতে মানুষের ভিড়। ছবি: প্রতিবেদক

 

টুটুলের মৃত্যু ও টিটনের একক আধিপত্য
২০০০ সালে র‌্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন টুটুল। এরপর টিটন ঢাকায় অবস্থান নিয়ে এককভাবে তার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। যদিও তিনি গোপনে কাজ করতেন, তবুও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট
স্থানীয়দের অভিযোগ, টিটন যশোর-ঢাকা রুটে একটি শক্তিশালী অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অস্ত্র এনে যশোর হয়ে ঢাকায় সরবরাহ করা হতো। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।

পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন
টিটনের বাবা ফখরুদ্দিন খুলনার একটি জুটমিলের কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবারে দুই মা, সাত ভাই ও পাঁচ বোন। বুধবার বড় ভাই রিপন তার লাশ ঢাকা থেকে বাড়িতে এনেছে। এশার নামাজের পর জানাজার নামাজ শেষে শহরের কারবার কবরস্থানে টিটনের মরদেহ দাফন করা হয়। স্থানীয়দের মতে, টিটন অবিবাহিত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় ছিলেন।  

এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং সংগঠিত অপরাধ চক্রের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।    

1000252027
বুধবার এশার নামাজের পর জানাজার নামাজ শেষে যশোর শহরের কারবার কবরস্থানে টিটনের মরদেহ দাফন করা হয়। ছবি: প্রতিবেদক

 

গতকাল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে নিউমার্কেট ১ নম্বর গেট ও শহিদ শাহ নেওয়াজ হল সংলগ্ন রাস্তায় মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত টিটনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে সে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। পরে স্থানীয়রা দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করলে তারা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে টিটনকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্থানীয়রা। সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে টিটনের মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা। এরপর দাফনের জন্য নিউমার্কেট থানা পুলিশ তার স্বজনদের কাছে মরদেহ বুঝিয়ে দেয়।  

প্রতিনিধি/ক.ম/

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর