জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের অফিস হলে ‘দ্বৈত নেতৃত্ব’ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন পরিকল্পনাবিদরা। এতে উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা, বিলম্ব ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বাংলামটরস্থ প্ল্যানার্স টাওয়ারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ‘উপজেলা পরিষদে এমপি অফিস: বিকেন্দ্রীকরণ না কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ?’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনের মূল প্রবন্ধে ইনস্টিটিউটের সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ‘অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখতে পাই সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরফলে জবাবদিহিতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পরে এবং স্থানীয় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘ভিন্ন রাজনৈতিক দলের যেমন, সরকারদলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য বা বিরোধীদলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য উপস্থিতিতে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় ‘দ্বৈত নেতৃত্ব’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা, বিলম্ব ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং বঞ্চিত হন সাধারণ জনগন। তবে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সাংবিধানিক সীমারেখা অনুসরণ করা হলে এই অবস্থান কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও সহায়ক হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্যের মূল কাজ আইন প্রণয়ন করা, অন্যদিকে স্থানীয় সরকারের কাজ হচ্ছে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া– এই দুইয়ের স্পষ্টত সীমারেখা থাকা জরুরি। বর্তমান বাস্তবতায় উপজেলা পর্যায়ে পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ করার মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের কাঠামোকে সুদৃঢ় করা সম্ভব। কারণ উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাবই উন্নয়নের প্রধান বাধা। একজন পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো, পরিবেশ ও নগর-গ্রাম সংযোগকে সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।’
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, ‘স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে উপজেলা, জেলা ও পৌরপরিষদের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি সম্পর্কে সবার সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘নিরাপদ নগর, ফুটপাত সংকট, মানসম্মত গণপরিবহন, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নসহ স্থানীয় সমস্যাগুলোর সমাধান স্থানীয় সরকারের কার্যকর ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল।’
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও ক্ষমতায়নের আহ্বান জানান এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ‘লোকাল পার্লামেন্ট’ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ‘যেখানে বিভাগের সংসদ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে সমস্যা ও সমাধান উপস্থাপন করতে পারবেন।’
প্রশ্নের উত্তরে মোসলেহ উদ্দীন বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মাঝে একটি ক্ষমতার টানাপোড়ন লক্ষ করা যায়, এখন উপজেলা পরিষদে এমপির কার্যালয় স্থাপন করা হলে এই সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে।’
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির পক্ষ থেকে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়। এগুলো-
১. এমপি’র অফিস থাকতে পারে- কিন্তু স্থানীয় সরকারের ভেতরে নয়।
২. প্রয়োজনে এমপিদের জন্য স্বতন্ত্র কনস্টিটুয়েন্সি অফিস (উপজেলা/জেলা পর্যায়ে) স্থাপন করা যেতে পারে– তবে প্রাথমিকভাবে ভার্চুয়াল প্লাটফরম স্থাপন করা যেতে পারে। এমপি’র ভূমিকা নীতিনির্ধারণ ও নজরদারিতে সীমাবদ্ধ রাখা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ না করা।
৩. স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় এমপি’র সরাসরি সিদ্ধান্তগ্রহণ ভূমিকায় না থাকা।
৪. এমপি-উপজেলা চেয়ারম্যান-প্রশাসনের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় কাঠামো তৈরি করা।
৫. এমপিদের জন্য নির্দিষ্ট জনসেবা প্ল্যাটফর্ম চালু করা।
এছাড়াও সংসদ সম্মেলনে শক্তিশালী ও কার্যকর উপজেলা পরিষদ গঠন এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন বিষয়ক কিছু সুপারিশ করা হয়। এগুলো হলো-
১. অবিলম্বে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতৃতে উপজেলার পরিচালন নিশ্চিত করা।
২. উপজেলা পরিষদকে প্রকৃত স্থানীয় শাসন কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপজেলা পরিষদের পূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত করা।
৩. উপজেলা পর্যায়ে পেশাদার পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ।
৪. উপজেলা সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা এবং সে মোতাবেক সকল উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা।
৫. দেশের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যে উপজেলা সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার আওতায় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং সে মতাবেক ইমারত নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা।
৬. উপজেলা পরিকল্পনাকে জেলা ও জাতীয় পরিকল্পনার সাথে সংযুক্ত করা এবং সারাদেশকে বিআইপি প্রস্তাবিত তিন স্তরভিত্তিক পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা।
৭. উপজেলা পরিষদের স্বতন্ত্র বাজেট ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে রাজস্ব আহরণের ক্ষমতা বৃদ্ধি।
৮. কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস, ইউএনও’র ভূমিকা সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ রাখা।
৯. নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা চালু করা।
১০. রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার গুলোতে স্থানীয় সরকার বিষয়ক অংশগুলোকে একীভূতকরণ করা।
১১. স্থানীয় সরকার কমিশন ২০২৫ এর রিপোর্ট পুনঃমূল্যায়নের জন্যে একটা সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন এবং এই কমিতিতে পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন পেশাজীবী এবং বিষয়ভিত্তিক এক্সপার্ট অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্যে প্রয়োজনীয় নীতি বাস্তবায়নের কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা।
এএম/এমআই