images

জাতীয়

লঞ্চচাপায় মৃত্যু: দাফনের টাকা ছাড়া কিছুই মেলেনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৬ এএম

# নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

# আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে: লঞ্চ মালিক সমিতি

# ঘটনার পর হত্যা মামলা ও তদন্ত কমিটি করা হলেও অগ্রগতি নেই

রাজধানীর সদরঘাটে লঞ্চচাপায় বাবা-মেরাজ ফকির ও ছেলে সোহেল ফকিরের মৃত্যুর ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি তাদের পরিবার। দাফন-কাফনের জন্য দেওয়া সামান্য অর্থ ছাড়া আর কোনো সহায়তা না পাওয়ায় চরম সংকটে আছে পরিবারটি। দুই উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিহত সোহেলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ পুরো পরিবারটি মানবেতর জীবনযাপন করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে একটি বৈঠক করেছে। সেখানে নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত সহায়তার বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা অর্থ সহায়তা কার্যকর হয়নি।

নিহত সোহেল ফকিরের চাচা সিরাজ ফকির ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা লঞ্চ মালিকদের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের সঙ্গে বসতে চায় মন্ত্রীর সঙ্গে বসতে চায় না। ফলে আমরা বলেছি মন্ত্রী যা বলবে আমরা তাই করব। আমরা তো মামলায় যেতে চাই না। দুইটা প্রাণ গেছে যাক কিন্তু পরিবারটাকে তো বাঁচাইতে হবে। কিন্তু তারা নাকি মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে না। আমাদের অনুরোধ তারা যেনো মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা এটাই চাই।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৮ মার্চ লঞ্চ জাকির সম্রাট-৩ এর চাপায় সোহেলের স্ত্রীর একটি পা ভেঙে যায়। এছাড়া তিনি অন্তঃসত্ত্বা। বর্তমানে ঢাকার মিটফোর্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার গর্ভের সন্তান সুস্থ রয়েছে। তবে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিবারে সোহেলের মা ও তিন ছোট বোন রয়েছে। তিন বোনের একজনের বয়স ১৪ বছর। অন্য দুজনের বয়স ৯ ও ৫ বছর। দুইজন উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়ে তারা এখন চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। পরিবারটির অভিযোগ, অনেক সময় অনাহারেও থাকতে হচ্ছে তাদের। এখন পর্যন্ত স্বজনরা খোঁজ নিলেও তা কতদিন চলবে তা নিয়ে প্রশ্ন।

নিহত সোহেলের চাচা ফারুক ফকির ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা তো এখনো কোনো প্রকার সহযোগিতা পেলাম না। মন্ত্রীর সঙ্গে আমরা দেখা করেছি তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন বিষয়টির একটা ব্যবস্থা করবেন। এজন্য বিআইডব্লিউটিএ’র একটা সহযোগিতার জন্য তারা আবেদন করতে বলেছে। চলতি সপ্তাহে আবেদনটা করা হবে। এজন্য আমরা চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের সুপারিশপত্র ও কাগজপত্রগুলো সংগ্রহ করছি।

নৌ-দুর্ঘটনায় সাধারণত সরকার থেকে দেড় লাখ টাকার সহায়তা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা নিহত পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়। এ কারণে পরিবারটির জন্য আরো কিছু করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবছে বিআইডব্লিউটিএ ও মন্ত্রণালয়।

Sadarghat_accident

ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা বসেছিলাম। পরিবারটিকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় তা আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রী নিজেই পরিবারটির পরিচিত একজন। ফলে তিনি বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।’

বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তারা তো আমাদের কাছে আসেনি। তারা মামলা করবে বলেছে। আমাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগও করেছিলাম, কিন্তু তারা নাকি মামলায় লড়বে। আসলে টাকা দিয়ে তো প্রাণের মূল্য হয় না। তবুও বাস্তবতা ও পরিবারটির কথা চিন্তা করে একটা ভালো সমাধান টানতে চাই। তারা আমার কাছে আসলে আমি লঞ্চের মালিকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারি। তারা ক্ষতিপূরণ চাইলে সেটাও আমরা দিতে প্রস্তুত।’

আবু বকর সিদ্দিক জানান, দুর্ঘটনার পর জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটির (ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট) চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে লঞ্চটি সদরঘাটে জেটিতে পড়ে আছে। মালিকের কোনো আয় হচ্ছে না। লঞ্চটির কর্মচারী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকলে বেকার সময় কাটাচ্ছেন। তিনি লঞ্চটি দ্রুত চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের কাছে।

গত ১৮ মার্চ রাজধানীর সদরঘাটে ঢাকা-ইলিশা রুটে চলাচল করা ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চটিতে যাত্রী ওঠানামা চলছিল। ঠিক সেই সময় পেছন দিক থেকে ‘জাকির সম্রাট-৩’ লঞ্চটি এসে ধাক্কা দেয়। এতে চাপা পড়ে বাবা-ছেলে নিহত হন এবং সোহেলের স্ত্রীসহ কয়েকজন আহত হন।

এ ঘটনায় নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করা হয়। এতে জাকির সম্রাট-৩ এর মালিক, চালক, সহকারী, কর্মচারীসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।

ওই ঘটনায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে।

এমআইকে/এমআর