জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
দুলাল আহমেদ এক সময় ঢাকায় চাকরি করতেন। কিন্তু করোনায় তার চাকরি চলে যায়। তখন থেকে তিনি রাইড শেয়ার করেই সংসার চালান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে তেল পেতে যে ভোগান্তি তাতে তিনি চরম বিপাকে পড়েছেন। গত তিন দিন আগে একটি পাম্প থেকে পাঁচ লিটার তেল নিয়েছেন। দুই দিন চলেছেন। এরপর আর নিতে পারেননি।
আজ শুক্রবার রাজধানীর পরীবাগের পাম্প থেকে তেল নেওয়ার জন্য ভোর সাড়ে ৩টার দিকে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। সকাল ৯টার দিকে তার সিরিয়াল ৫০৫। তিনি জানান, আজ তেল পেতে দুপুর গড়াতে পারে।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পরীবাগ এলাকায় দুলালের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
পরে ওই লাইনের আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, সন্ধ্যা নাগাদ তেল পেতে পারেন, এই আশায় দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তার আগে তেল দেওয়া বন্ধ হয়েও যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
রবিউল ইসলাম একই লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোর ৩টার দিকে। তিনি বলেন, ‘গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত রাইড শেয়ার করেছি। খেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ভোর ৩টায় চলে আসছি। কখন যে তেল পাবো, তা জানি না। তবে আশায় আছি।’
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিপরীত পাশের সড়কে যে তেল পাম্প সেটিতে কয়েক দিন আগেও তেল পেতে বাইকারদের লাইন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আজিজ মার্কেট শাখা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কিন্তু আজ শুক্রবার দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।
আরও পড়ুন: সংকট বাড়াচ্ছে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত
বাইকাররা সকাল হওয়ায় অনেকে তখন নাস্তা কিনে বাইকে বসে খাচ্ছিলেন। কেউ কেউ আবার সেলফি তুলে রাখছেন। তারা বলছিলেন, শুক্রবার হওয়ায় ছুটি পেয়ে লোকজন সকাল সকাল এসেছে। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবারও এমন দীর্ঘ লাইন ছিল না।
তেলের জন্য অপেক্ষমান বাইকাররা জানান, গত কয়েক দিন থেকে ফুয়েল পাস সহজ করেছে সরকার। এখন অ্যাপসে রেজিস্ট্রেশন করে পাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অ্যাপস সঙ্গে থাকলেই তেল মিলছে। তবে তা মাত্র এক হাজার টাকার। এক হাজার টাকার তেল নিলে কারও কারও তিন থেকে চারদিন যাচ্ছে, যা রাইড শেয়ারকারীদের কিছু সাশ্রয় হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
পরীবাগ থেকে কাটাবন সিগন্যালে এসে দেখা গেল আরেকটি লাইন। এখানে সিগন্যাল থেকে খানিকটা পশ্চিমের একটি পাম্পে তেল দেওয়া হবে বিকেল পাঁচটায়। কিন্তু ততক্ষণে দীর্ঘ লাইন হতে শুরু করেছে। একে একে মোটরসাইকেল চালকরা এসে লাইনে মোটরসাইকেল দাঁড় করাচ্ছেন।
স্ত্রীকে নিয়ে সাতসকালে তেল নিতে এসেছিলেন রুবেল সরকার। তিনি ঘণ্টাখানে লাইনে ছিলেন। পরে চলে যাচ্ছিলেন। কারণ, পাম্পটিতে বিকেলে তেল দেওয়া হবে। কিন্তু সকাল ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন বাইকাররা।
আরও পড়ুন: জ্বালানি তেল সংকটে পদে পদে ভোগান্তি
সেখান থেকে সোজা আসাদগেটের পশ্চিমে থাকা সোনার বাংলা পাম্পের চিত্র দেখতে যান এ প্রতিবেদক। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, আসাদগেট থেকে টাউনহল, সেখান থেকে মসজিদ হয়ে বাজার হয়ে লাইন চলে গেছে ভেতরের আবাসিক মহল্লার দিকে। এই লাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার।
লাইনে দাঁড়ানো সবুজ বলছিলেন, ঢাকায় রাইড শেয়ার করি। দুই দিন পরপর তেল নিতে হয়। আজ ছুটির দিন। ফলে সবাই একসঙ্গে এসেছে। তেল না নিয়ে তো উপায় নাই। তেল ছাড়া চলব কী করে? যতক্ষণ লাগুক তেল নিতে হবেই।
সেই লাইনে দাঁড়ানো আসলাম বলেন, ‘আমি আগে জেলা শহরে ছিলাম। কিন্তু ঢাকায় রাইড শেয়ারে ভালো টাকা কামাই করা যায় শুনে কয়েক মাস আগে এসেছি। এখন তো এসে বিপাকে পড়েছি। আয় রোজগার করতে হলে তো তেল নিতে হবে। কিন্তু এই তেল নিতে তো ঘাম ঝরে যাচ্ছে।’
তেল নেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো ব্যক্তিরা বলেন, পাম্প ছাড়া বাইরে অকটেন ২৫০ টাকা থেকে সাড়ে ৩০০ টাকায় লিটার বিক্রি হচ্ছে। তাও ভালো না। ভেজাল তেল। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছেন ভেজালমুক্ত তেল পাওয়ার আশায়। এ কারণে ভোগান্তি মেনেই তারা তেল পেতে আগ্রহী।
এমআইকে/এমআই