images

জাতীয়

ত্রিমুখী সংকটে রান্নাঘরে অচলাবস্থা, চরম দুর্ভোগে নগরবাসী

মহিউদ্দিন রাব্বানি

০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

রাজধানী ঢাকায় চলমান গ্যাস সংকট এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, এটি নগরজীবনের নিত্যদিনের দুর্ভোগে রূপ নিয়েছে। লাইনের গ্যাসে স্বল্পচাপ, পাইপলাইন মেরামতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন এবং বাজারে এলপিজির সংকট ও চড়া দাম—এই ত্রিমুখী সংকটে রাজধানীর লাখো পরিবার চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছে। রান্নাঘর অচল হয়ে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে নগরবাসীর।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কাফরুল, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, বাসাবো ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চুলা একেবারেই জ্বলে না। কোথাও আবার গভীর রাত বা ভোরে কয়েক ঘণ্টার জন্য অল্প চাপের গ্যাস এলেও তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না সম্ভব হচ্ছে না।

শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা গৃহিণী কানিজ আক্তার বলেন, রান্নার নির্দিষ্ট সময় বলে কিছু নেই। গ্যাস এলে তখনই হাঁড়ি বসাতে হয়। মাঝরাতে রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিচ্ছি। পরিবার নিয়ে এভাবে চলা খুব কষ্টকর।

একই এলাকার আরেক বাসিন্দা জানান, শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

আরও পড়ুন

এলপিজি সংকটে হোটেলে বাড়ছে খাবার কেনার চাপ

গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে কর্মজীবী পরিবারগুলো। সকালে রান্না করতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে হোটেল বা রাস্তার দোকানের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে দৈনন্দিন খরচ, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও বাড়ছে। মুস্তাফিজ নামে মালিবাগের এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, গ্যাস না থাকলেও মাস শেষে বিল ঠিকই আসে। রান্না করতে না পেরে বাইরে খেতে হচ্ছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

Gas3
গ্যাস সংকটে নাজেহাল গৃহিনীরা। ছবি: ঢাকা মেইল

লাইনের গ্যাস না পেয়ে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে এলপিজি চুলা ব্যবহার শুরু করলেও সেখানেও মিলছে না স্বস্তি। বাজারে এলপিজির সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের কথা বললে দোকানদার গ্যাসই দিতে চায় না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দুই হাজার টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।

এই অবস্থায় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি সাময়িকভাবে সারাদেশে এলপিজি বিক্রি ও সরবরাহে ধীরগতি এনেছে। এতে জনদুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র খাবার ব্যবসায়ীরাও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

আরও পড়ুন

এলপিজির লাগামহীন দাম নিয়ন্ত্রণ করবে কে?

এদিকে ঢাকার আমিনবাজারে তুরাগ নদীর তলদেশে থাকা বিতরণ গ্যাস পাইপলাইন মালবাহী ট্রলারের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামত কাজ সম্পন্ন হলেও রাজধানীতে গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ এখনো ফিরেনি। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেরামতের সময় পাইপলাইনে পানি প্রবেশ এবং সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ ঘাটতির কারণে এই স্বল্পচাপের সমস্যা তৈরি হয়েছে।

তিতাস গ্যাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ধাপে ধাপে গ্যাসের চাপ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

তিতাসের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল আমিন জানান, মালবাহী ট্রলারের নোঙ্গরের আঘাতে আমিন বাজারে তুরাগ নদীর তলদেশে ক্ষতিগ্রস্ত বিতরণ গ্যাস পাইপলাইন মেরামত করা হলেও মেরামতকালীন পাইপে পানি প্রবেশ করায় এবং একই সাথে ঢাকা শহরে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় ঢাকা মহানগরীতে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনার ঘাটতি ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফলেই আবাসিক গ্রাহকরা বারবার সংকটের শিকার হচ্ছেন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় নগরবাসীর রান্নাঘর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

Gas2
এলপি গ্যাসের দাম নিয়ে চলছে নৈরাজ্য। ছবি: ঢাকা মেইল

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে লাইনের গ্যাস ও এলপিজি—উভয় সংকটের স্থায়ী সমাধান করা হবে। অন্যথায় রাজধানীর রান্নাঘরের এই দুর্ভোগ ধীরে ধীরে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।

এদিকে বাজারে এলপি গ্যাস সংকটের বিষয়ে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এখন ব্যবসায়ীর অপর নাম মানুষকে জিম্মি করে পকেট কাটা। আমদানি কম হলে সেটা এক মাস আগে জানানোর কথা। কারণ এলপিজি দেশে আসতে সময় লাগে কমপক্ষে এক মাস। হঠাৎ শীত প্রকট হলে লাইনের গ্যাসে সংকট দেখা দিলে এলপিজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজার থেকে সিলিন্ডার উধাও, বিষয়টিতে পরিষ্কার- এখানে আমদানিকারক, তাদের ডিস্ট্রিবিউটর ও পাইকারি-খুচরা  বিক্রেতাদের কারসাজি আছে।

আরও পড়ুন

পাইপলাইন মেরামতের পরও ঢাকায় গ্যাসে স্বল্পচাপ, সমাধানের চেষ্টা

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আবার ভোক্তা অধিদফতর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম আদায়কারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে, তখন তারা পালিয়ে যাচ্ছেন, দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন এবং সর্বশেষ ধর্মঘট করে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখছেন। এটা সরকারের আইনের প্রতি পুরোপুরি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। ভোক্তা অধিদফতর অভিযান পরিচালনাকালে সর্বত্রই বিস্ফোরক অধিদফতরের লাইন্সেবিহীন দোকান, বেশি দামে বিক্রিসহ নানা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও তারা বলেন হয়রানি করা হচ্ছে। বিষয়টি সরকারকে বেকায়দায় ফেলানোর চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয়। জনগণকে জিম্মি করে মানুষের পকেট কাটা ও মুনাফা লাভের অপচেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।

এমআর/জেবি