# সারাদেশে এলপিজি বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ ঘোষণা
# লাইনের গ্যাস বন্ধ থাকায় এলপিজিতে নির্ভরতা বাড়ছে
বিজ্ঞাপন
# বড় কোম্পানির আমদানি বন্ধ, ডিলার পর্যায়ে গ্যাস সংকট
# সংকটকে কারসাজি বলছে সরকার
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে এলপিজি গ্যাসের বাজার এখন যেন এক অস্থির সাপলুডু খেলার মতো। কাগজে-কলমে দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় মেলে না। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের বাইরে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখ লাখ ভোক্তা।
দীর্ঘদিন ধরে লাইনের গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধ থাকায় দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ রান্নার জন্য সম্পূর্ণভাবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে এলপিজি গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখের কাছাকাছি।
বিজ্ঞাপন
সরকারি দাম ও বাস্তব বাজারের ফারাক
গত ডিসেম্বরে বিইআরসি প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করে। অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ১ টাকা ৭৪ পয়সা বাড়িয়ে ৫৭.৩২ টাকা করা হয়।
নতুন বছরের শুরুতে জানুয়ারির জন্য আবারো দাম বাড়ানো হয়। ৪ জানুয়ারি বিইআরসি ঘোষণা দেয়, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা হয়েছে। অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা ৪৮ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে ৫৯.৮০ টাকা হয়। তবে বাস্তব বাজারে এই নির্ধারিত দাম কার্যত অদৃশ্য। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
ভোক্তাদের দুর্ভোগ চরমে
একদিকে দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে সরবরাহ বন্ধ-সব মিলিয়ে এলপিজি বাজারে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে দিয়েছে। এই ‘সাপলুডু’ খেলায় প্রতিদিনই হেরে যাচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
রাজধানীর ডেমরা এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে জানান, লাইনের গ্যাস না থাকায় বাসায় রান্নার একমাত্র ভরসা এলপিজি। গত সপ্তাহে গ্যাস শেষ হয়ে গেলে বাজারে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন তিনি। সরকার নির্ধারিত দামের কথা বললে দোকানদার ২ হাজার টাকা দাবি করেন।
শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মাত্র দুই সপ্তাহ আগে গ্রামের বাড়িতে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছি ১ হাজার ৩০০ টাকায়। অথচ ঢাকায় এসে একই সিলিন্ডারের দাম ৭০০ টাকা বেশি। কয়েকটি দোকানে ঘুরেও গ্যাস পাইনি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই ২ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে।’
মধ্যবাড্ডা এলাকার বাসিন্দা রেজাউল বলেন, ‘এক মাস আগে ১ হাজার ৪০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনেছিলাম। এখন বাজারে এলপিজি নেই, থাকলেও চড়া দাম। এতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। আমাদের কষ্ট কেউ বোঝে না।’
সংকটের পেছনের কারণ
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ডিলার পর্যায়ে গ্যাসের সংকটের কারণেই দাম বেড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের দুটি বড় এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে গ্যাস আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে এমন সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে ডিলাররা বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।
আরও পড়ুন: ঘরে ঘরে ‘মৃত্যুবোমা’ এলপিজি
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি জানায়, বর্তমানে দেশে এলপিজি চরম সংকটময় মুহূর্ত চলছে। সংগঠনটি বলছে, ২৭টি কোম্পানির সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার বাজারজাত করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল (পুনরায় গ্যাস ভরা) হচ্ছে। অর্থাৎ বাকি ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে।
সারাদেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ
এমন সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই আজ থেকে সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। বুধবার (৭ জানুয়ারি) এক নোটিশে সংগঠনটি জানায়, তাদের ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের সব এলপিজি বিপণন ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে কোম্পানির প্ল্যান্টগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনও স্থগিত থাকবে।
এর আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয় সংগঠনটি। দাবি না মানলে অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি কী
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বলেন, দেশে বর্তমানে চরম এলপিজি সংকট চলছে। পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই বিইআরসি নতুন দাম ঘোষণা করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ থাকবে। বেলা তিনটায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দাবি মানা হলে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি শুরু হবে। না মানলে বিক্রি বন্ধ থাকবে।
পরিবেশকের কমিশন ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকায় উন্নীত করা, খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে ৭০ টাকায় বৃদ্ধি, এলপিজি পরিবহনকারী গাড়িতে পুলিশি হয়রানি বন্ধ, ভোক্তা অধিকার সংস্থার চলমান অভিযান স্থগিতসহ বিভিন্ন দাবি জানায় সংগঠনটি।
বিইআরসি ও সরকারের অবস্থান
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, এলপিজি পরিবেশকরা কমিশনের লাইসেন্সধারী না হওয়ায় আইনগতভাবে তাদের দাবি সরাসরি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। লাইসেন্সপ্রাপ্ত আমদানিকারকরা প্রস্তাব দিলে যাচাই-বাছাই ও গণশুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দাবি করেছেন, দেশে এলপিজির প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। বাজারে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা মূলত কারসাজির ফল। বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর কাজ করছে।
এমআর/এমআর

