বোরহান উদ্দিন
২৯ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০৬ পিএম
টানা একমাস ধরে দেশের ওপর দিয়ে বইছে তাপপ্রবাহ। গরমে নাভিশ্বাস উঠেছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জায়গা ছাড়া ঘরে-বাইরে কোথাও নেই স্বস্তি। তাই গরমের এই উত্তাপ বদলে দিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের রুটিন। বিশেষ করে রোদ এড়িয়ে চলতে সময় বিবেচনা করে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন মানুষ। সঙ্গে নিচ্ছেন রোদ এড়ানোর আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন পেশাজীবী থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের মানুষেরাও সাধ্যের মধ্যে বদলে নিয়েছেন কাজকর্ম। অনেকে খাদ্যাভাসেও এনেছেন পরিবর্তন।
আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, গত ৭৬ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে এবারের তাপপ্রবাহ। সবশেষ ১৯৯২ সালে মাসজুড়ে এমন তাপপ্রবাহ দেখা দিলেও এবারের মতো দেশজুড়ে ছিল না। তাই মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে বেশি। এমন অবস্থার মধ্যেও আপাতত বৃষ্টি কিংবা তাপপ্রবাহ কমার সুখবর নেই আবহাওয়া অধিদফতরের কাছে। ইতোমধ্যে ৪৩ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছে তাপমাত্রার পারদ।

এদিকে গরমের কথা বিবেচনা করে সবধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বৃহস্পতিবার (২ মে) পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ঈদের পরে লম্বা ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত তিনজন শিক্ষক হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সাদা-কালো পোশাকে বছরজুড়ে আদালত চত্বর মুখর রাখা আইনজীবীদের পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আদালতে কোর্ট এবং গাউন ছাড়াই পেশাগত কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন আইনজীবীরা। অবশ্য উচ্চ আদালতে শুধু গাউন ছাড়া প্র্যাকটিস করতে পারছেন তারা। উচ্চ আদালতের আইনজীবীরাও নিম্ন আদালতের মতো গাউন, কোর্ট ছাড়া আদালতে কাজ করার সুযোগ চাচ্ছেন।
কী পরিবর্তন এনেছে তাপপ্রবাহ?
টানা মাসখানেক সময় ধরে চলা তাপপ্রবাহের কারণে জীবনাচরণে কেমন পরিবর্তন এসেছে তা জানতে একাধিক শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে ঢাকা মেইল। গরমের কারণে ঘরে-বাইরে প্রাত্যহিক কাজকর্মে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছে জনসাধারণ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজমীর সুমি জানান, গরমের কারণে পেশাগত কাজে পরিবর্তন এসেছে। এমনকি খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে পারিবারিক কাজেও পরিবর্তন এনে দিয়েছে তীব্র গরম। যেমন পরিবর্তন করোনাকালে হয়েছিল।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘গরমের তীব্রতা বাড়ার আগেই কোর্টে যাওয়ার চেষ্টা করছি। বাইরের কাজ শেষ করে দ্রুত বাসা ফেরার চেষ্টা করি। আগে আদালত শেষে বাসায় এসে পরে সান্ধ্যকালীন চেম্বারে যাওয়া হতো। এখন একবারে চেম্বারের কাজ শেষ করে বাসায় যাই। কারণ গরমে বারবার বের হওয়া কঠিন।’
খাদ্যাভাসে পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাইরের খাবার পরিহার করছি। আগে দুপুরে আদালতে লাঞ্চ করতাম। এখন কমিয়ে দিয়েছি। বাসায় রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিই। চা-কফি এক বেলায় নামিয়ে এনেছি। লেবুর শরবত, পানীজাতীয় খাবার বেশি খাচ্ছি। ভাজা ও মসলাযুক্ত খাবার কম খাওয়া হচ্ছে। বাইরের দাওয়াতে যোগ দেওয়া একদমই কমিয়ে দিয়েছি।’

পুরান ঢাকার সুভাষ ঘোষ লেনের গৃহিণী মর্জিনা বেগম। গরমের কারণে বদলে ফেলেছেন তার বাসার দৈনন্দিন রান্নার রুটিন। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে সবকিছুই ঘরে তৈরি করেন তিনি। সাধারণত বেলা ১২টার দিকে শুরু করলে তাপদাহ শুরুর পর থেকে নাস্তা তৈরির সঙ্গে দুপুরের রান্নাও সেরে ফেলেন বলে জানালেন।
লক্ষ্মীবাজারের ফুটপাতে বাচ্চাদের গেঞ্জি-প্যান্ট বিক্রি করেন শরীয়তপুরের শহিদুল ইসলাম। জানালেন গরমে বিক্রি কমেছে। রোদ থেকে বাঁচতে দোকানও কম সময় খোলা রাখছেন।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘জান বাঁচলে দোকান করা যাবে। এই রোদে কেমনে দোকান খুলবো? কেনার মানুষও রাস্তায় নেই। আগে ১২টার দিকে শুরু করতাম, এখন ৩টার পরে শুরু করি। যা বিক্রি হয় তা দিয়ে কোনোমতে চলতেছি।’
রাজধানীতে দেখা গেছে, অনেকেই এখন বাইরে বের হলে ছাতা ব্যবহার করছেন। সঙ্গে পানির বোতল রাখছেন। চলার পথে ছায়া খুঁজে বেড়াতেও দেখা গেছে পথচারীদের।

অবশ্য কিছু কিছু পেশার লোকজনের গরমের মধ্যেও দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মে খুব একটা পরিবর্তন আনার সুযোগ হচ্ছে না বলে জানা গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সি এম মোসাব্বের রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গরমে অন্যদের মতো আমাদের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কাজকর্মে খুব পরিবর্তন আনা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত থাকতে হয়। যারা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন তাদেরও সেখানে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত রোগী দেখতে হয়। চাইলেও সেখানে পরিবর্তন আনা কঠিন। আবার সময় পরিবর্তন হলে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা বিপাকে পড়বেন সেটাও ভাবতে হয়। তবে গরমের কারণে অপারেশন সময় অনেক সময় রাতে করা হচ্ছে। আগে যারা একাধিক অপারেশন করতেন তারা কেউ কেউ সংখ্যা কমিয়ে আনছেন গরমের কারণে। রোগীরাও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালে ভর্তি হতে বেশি আগ্রহী। অবশ্য এতে তাদের খরচ বাড়ছে।’
১০ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন রিকশা চালক রইসুল মিয়া। ফরিদপুরের এই মানুষটির বয়স ৫৫ বছর। ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এত গরম কোনোদিন দেখিনি। যাত্রী টানতে কষ্ট হয়। বইসা থাকলে তো পেট চলবে না। এই জন্য বেশি রোদের মধ্যে চালাই না। সুযোগ পাইলে জিরাইয়া নেই।’
তাপপ্রবাহ নিয়ে কী তথ্য দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদফতর?
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, চলতি এপ্রিলে টানা যত দিন তাপপ্রবাহ হয়েছে, তা গত ৭৬ বছরে হয়নি। গত বছর (২০২৩) একটানা ১৬ দিন তাপপ্রবাহ হয়েছিল। এবার তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে ১ এপ্রিল থেকে। যা এখনো চলছে। তবে শেষ হবে তাও সুনির্দিষ্ট করে বলার সুযোগ নেই।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ থেকে তাদের কাছে বিভিন্ন স্টেশনের আবহাওয়ার তথ্য-উপাত্ত আছে। তবে সব বছরে সব স্টেশনের উপাত্ত নেই। উপাত্তগুলো একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে আছে ১৯৮১ সাল থেকে। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ১৯৪৮ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবাহ হয়েছে এবারের এপ্রিল মাসে।

আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘আমরা ১৯৪৮ সাল থেকে উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছি, এবারের মতো তাপপ্রবাহ টানা আগে হয়নি। বলা যায়, ৭৬ বছরের রেকর্ড এবার ভেঙে গেছে। তবে মে মাসের শুরুর দিকে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।’
কেন এত তাপ, স্বস্তি মিলবে কীভাবে?
টানা এমন তাপপ্রবাহের জন্য আবহাওয়াবিদ, জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা চারটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তা হলো- উপমহাদেশীয় উচ্চ তাপ বলয়, শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, এল নিনোর সক্রিয়তা এবং বজ্রমেঘের কম সংখ্যা।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রচণ্ড তাপ, এর কারণ বৈশ্বিকভাবেই তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। তাপমাত্রা বৈশ্বিকভাবে ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে।’
তবে কবে নাগাদ এই তাপপ্রাবহ থেকে স্বস্তি মিলতে পারে তা সুনির্দিষ্ট করতে না পারলেও আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে সৃষ্টি হওয়া কোনো মেঘের মাধ্যমে বৃষ্টি হলে এই তাপপ্রবাহ কমবে না। বড় ধরনের বজ্রঝড়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী- এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘কিছু এলাকায় মাত্রার চেয়ে বেশি তাপ থাকছে। কোনো এলাকায় সবুজ এলাকা কম থাকলে এবং কংক্রিটের পরিমাণ বেশি থাকলে তাপমাত্রাও বেশি থাকে। অধিক তাপমাত্রার এই এলাকাগুলোই হিট আইল্যান্ড হয়ে ওঠে। ঢাকাও দিন দিন হিট আইল্যান্ড হয়ে উঠছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সবুজ এলাকা জলাশয় বাড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় দিন দিন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।’
বিইউ/জেবি