Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

খালেদা জিয়াকে তিলে তিলে মারতে ফুড পয়জনিং করা হয়েছিল: রিজভী

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে ‘ফুড পয়জনিং’ করে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী। এই ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে একটি ‘অতি জরুরি ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন’ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৬ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আয়োজিত বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন।

রিজভী বলেন, যে মানুষটি প্রতিটি মুহূর্তে স্বদেশ এবং দেশের জনগণের স্বার্থ নিয়ে ভেবেছেন, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ১৯৮১ সালে বিএনপিতে যোগদানের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিটা ক্ষণ তিনি মানুষের পক্ষে কথা বলে গেছেন। আর এই জন্য তাকে সইতে হয়েছে অশেষ গঞ্জনা, অপপ্রচার এবং মিথ্যা কলঙ্কলেপন।

সাবেক সরকারের কঠোর সমালোচনা করে রিজভী বলেন, তার অসুস্থতাকে ফ্যাসিবাদী সরকার গ্রাহ্য করেনি। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা নিজেরা বন্দি হয়ে অসুস্থতার অজুহাতে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বা বিদেশে গেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্যে সেই সুযোগটুকুও জোটেনি। তার উন্নত চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই তারা করেনি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমরা বারবার বলেছি যে, উনাকে তিলে তিলে শেষ করার জন্য ফুড পয়জনিং করা হয়েছে এবং এটা আসলে সত্য। বর্তমান সরকারের এ বিষয়ে একটি অতি জরুরি ও হাই পাওয়ারফুল তদন্ত কমিটি করা দরকার।

কারাগারে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, যে মানুষটি হেঁটে কারাগারের ভেতরে গেলেন, সেই মানুষটি জরাজীর্ণ অবস্থায়, অসুস্থতায় ধুঁকতে ধুঁকতে বের হলেন। এবং এই রোগে ধুঁকতে ধুঁকতেই গত বছর ৩০ ডিসেম্বর তার জীবনাবসান হলো।

বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বের প্রভাব উল্লেখ করে রিজভী বলেন, তিনি ঘরে বসে থাকলেও আমরা তার বিরাট প্রভাব অনুভব করতাম। আমরা তখন তোয়াক্কা করতাম না— কে হাসিনা, কে তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কি তার নির্যাতন, গ্রেফতার, মামলা বা রিমান্ড! আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র ফেরানো এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কারণ তার একমাত্র উৎস ছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের কথা স্মরণ করে রিজভী বলেন, তিনি বলেছিলেন এরশাদ একটি বেআইনি লোক, তার ক্ষমতা গ্রহণের কোনো অধিকার ছিল না। উনার মতো অনেকে বললেও পরে পালিয়ে গেছেন বা নির্বাচনে গেছেন; কিন্তু বেগম জিয়া যাননি। তিনি বলেছিলেন, এরশাদের অধীনে নির্বাচন হবে প্রতারণার নির্বাচন, যা প্রমাণিত হয়েছে। এই যে কথা এবং কাজের অসাধারণ মিল, এসব কারণেই জনগণ তাকে ভোলেনি এবং ১৯৯১ সালের অবাধ নির্বাচনে তাকে বিজয়ী করেছে।

ফারাক্কা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ফারাক্কার পানির ন্যায্য পাওনার বিষয়টি জাতিসংঘে নিয়ে গেছেন। কার কত অ্যাটম বোম বা মিসাইল আছে তা তিনি পাত্তা দেননি। একইভাবে ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের তাড়ানো হলে তিনি হোয়াইট হাউজে গিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরাম গড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে ২৯ শতাংশ নারী তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত হয়। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা তিনি শুরু করেছিলেন এবং বিএ পর্যন্ত করার কথা দিয়েছিলেন।

তারেক রহমানের ১৮০ দিন

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, তারই ধারাবাহিকতায় আজ তার সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমান দেশ পরিচালনা করছেন। তিনি মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। গত ১৮০ দিনে তিনি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের ঘোষণা দিয়েছেন। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার খাল খনন এবং ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু করেছেন।

প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ড্রেস, ব্যাগ ও জুতা দেওয়া হচ্ছে। ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি এবং শিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করতে ট্যাব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খালেদা জিয়ার আইনি লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ম্যাডামকে আমরা বলতাম মাদরাসা কোর্ট একটি ক্যাঙ্গারু কোর্ট, আন্দোলনে যাই। কিন্তু তিনি বলতেন— আন্দোলন চলুক, তবে আমি আইনি লড়াই শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়ব। জেলখানাতেও তাকে টলানো যায়নি। তিনি বীরদর্পী হিসেবে হিমালয়ের মতো অটুট থেকেছেন, শেখ হাসিনাকে কোনো স্বীকৃতি দেননি।

সবশেষে নেতাকর্মীদের দুর্নীতির আশ্রয় না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন চেষ্টা করেও যাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে পারেনি, সেই দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা অনুসরণ করলে আমরা সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী হতে পারব। আমরা যদি নির্ভয় গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে পারি, তবেই তাকে প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।

মিলাদ মাহফিলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক বদরুদ্দোজা বাদল, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী,  জাতীয়বাদী আইনজীবী সমিতির নেতা গাজী তৌহিদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম সজলসহ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে বেগম খালেদা জিয়া তার পরিবারের মৃত ব্যক্তি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ এবং বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের শহীদ নেতাকর্মীদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া করা হয়।

আরএনবি/এফএ