Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

চোখ বেঁধে ইলেকট্রিক শক, ছিঁড়ে যায় রেটিনা: ট্রাইব্যুনালে ডা. আশিক

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৮ পিএম

ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে চিকিৎসক আশিক বলেছেন, ২০১৬ সালে আমাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ৬০ দিন অজ্ঞাত স্থানে গুম করে রাখা হয়। চোখ বেঁধে ইলেকট্রিক শক, ঝুলিয়ে রাখা আর অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়া হয় ভুয়া স্বীকারোক্তি। সেই নির্যাতনে আমার ডান চোখের রেটিনা ছিঁড়ে গেছে। এরপর র‍্যাব নাটক সাজিয়ে অস্ত্র ও নাট-বল্টু দিয়ে আমাদের নামে একাধিক মামলা দেয়।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ হাজির হয়ে এভাবেই নিজের ওপর নেমে আসা  নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন ‘গুমের শিকার’ চিকিৎসক আশিক উল আকবর।

ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্বরতার’ চিত্র তুলে ধরেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‍্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে এই সাক্ষ্য দিলেন তিনি।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

ডা. আশিক জানান, ২০১৬ সালে তিনি রংপুরের প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ওই বছর ২৩ মে রাত সাড়ে ৩টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে মামার বাসা থেকে ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারী লোক তাকে তুলে নিয়ে যায়। মাথায় কালো কাপড় পরিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তুলে প্রায় দেড় ঘণ্টা ঘোরানোর পর তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নেওয়া হয়।

সেখানকার পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, একটি স্টিলের দরজার ওপারে কাপড় দিয়ে ঘেরা জায়গায় আমাকে রাখা হতো। সার্বক্ষণিক হ্যান্ডকাফ ও চোখ বাঁধা থাকতো। দিনে মাত্র দুবার ৪-৫টি সিঁড়ি নেমে টয়লেটে যাওয়ার অনুমতি ছিল। তিন মিনিটের বেশি সময় নিলেই চলতো অমানবিক মারধর। খাওয়ার সময় ছাড়া বাকি সব সময় চোখ ও হাত বাঁধা থাকতো। সামান্য দেরিতে খাবার খেলে লাঠি হাতে থাকা প্রহরীরা মারধর করত।

ডা. আশিক উল আকবরের দাবি, তৎকালীন শেখ হাসিনা ও তার ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের’ বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার থাকায় ৬০ দিন গুম করে রেখে এই নৃশংস মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় । তৎকালীন সময়ে তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে জবানবন্দিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, আমাকে জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেওয়া হয়। আমি অস্বীকার করলে দুই হাতে গামছা ও হুক বেঁধে একটি মেশিনের মাধ্যমে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দুই কানের লতিতে দেওয়া হয় ইলেকট্রিক শক। যন্ত্রণায় টিকতে না পেরে তারা যা বলেছে, আমি তাতেই সই করতে রাজি হয়েছি।

তিনি আরও জানান, চোখ বাঁধার সময় এক সদস্য অত্যন্ত শক্ত করে বাঁধন দেওয়ায় তার ডান চোখে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় এবং রেটিনা ছিঁড়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে জেল থেকে বের হয়ে তাকে চোখের অপারেশন করাতে হয়েছিল। নির্যাতনের মুখে বাধ্য হয়ে র‍্যাবের লিখে দেওয়া একটি প্রিন্টেড কাগজ দেখে তাকে সাদা কাগজে স্বীকারোক্তি লিখে দিতে হয়েছিল।

আশিক জানান, ৬০ দিন গুম রাখার পর ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তাকেসহ আরও তিনজনকে (মাহমুদুল হাসান, নাজমুস সাকিব ও শরিয়তুল্লাহ শুভ) র‍্যাব-১ এর মিডিয়া সেন্টারে উপস্থিত করা হয়। তার আগে তাদের চুল-দাড়ি কেটে নতুন কাপড় পরিয়ে, র‍্যাবের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরানো হয়।

তিনি বলেন, মিডিয়া সেন্টারে গিয়ে দেখি একটি ব্যাগে কিছু অস্ত্র, নাট-বল্টু ও জিহাদি বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আমাদের সেই টেবিলের পেছনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয় এবং ‘জেএমবি সদস্য’ হিসেবে প্রচার করা হয়।

তবে ওইসব জিনিসের (অস্ত্র, নাট-বল্টু ও জিহাদি বই) সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে জবানবন্দিতে দাবি করেছেন এই সাবেক শিবির নেতা।

জবানবন্দিতে চিকিৎসক আশিক জানান, তার নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাবা জয়দেবপুর থানায় একটি অপহরণ মামলা করেছিলেন। সেই মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে রিমান্ডে নিয়ে পুনরায় নির্যাতন করা হয়।

তিনি বলেন, টঙ্গী থানার তৎকালীন ওসি প্রথমে মামলা নিতে না চাইলেও ওপরের চাপে শেষ পর্যন্ত র‍্যাবের সাজানো মামলা গ্রহণ করেন। বাবার করা অপহরণ মামলাটি তুলে নিতে আমাকে ডেমরা ও আশুলিয়া থানার একাধিক মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং রিমান্ডে থাকাকালীন হুমকি দেওয়া হয়।

টানা ১৩ মাস জেল খাটার পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্ত হন ডা. আশিক। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তার শিক্ষাজীবন থেকে তিনটি বছর হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তিনি এমবিবিএস সম্পন্ন করেন।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আমি গুম কমিশন ও ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছি।

জবানবন্দি শেষে তিনি শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকী এবং সংশ্লিষ্ট র‍্যাব কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

জবানবন্দিতে শেষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আসামি কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম আজাদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন এবং লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমনের পক্ষে আইনজীবী মো. শাহীনুর ইসলাম ভুক্তভোগীকে জেরা করেন।

গুম থাকাকালীন কেন আদালতে অভিযোগ করেননি— এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. আশিক বলেন, তৎকালীন পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না এবং র‍্যাবের ভয়ে আমরা আতঙ্কিত ছিলাম।

আসামিপক্ষের জেরা চলমান রয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

আশিক ছাড়াও এই মামলায় এখন পর্যন্ত ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমানসহ পাঁচ জন জবানবন্দি দিয়েছেন। 

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি শুরু হয় এই সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব। বর্তমানে ১৭ আসামির মধ্যে গ্রেফতার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন ১০ জন। তারা হলেন– র‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম।

পলাতকরা হলেন— সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র‍্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ ও র‍্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. খায়রুল ইসলাম।

আরএনবি/এফএ