মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘জিয়াউল আহসান নিজেই মাথায় গুলি করে একজনকে পানিতে ফেলে দেন’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০:১০ এএম

শেয়ার করুন:

‘জিয়াউল আহসান নিজেই মাথায় গুলি করে একজনকে পানিতে ফেলে দেন’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ছবি: সংগৃহীত

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও র‍্যাব-৩ এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) মো. রফিকুল ইসলাম আদালতে এক চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন।২০১১ সালের এক রাতে তৎকালীন র‍্যাব সদরদফতরের ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে এবং তার নির্দেশে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

আওয়ামী লীগের আমলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল সোমবার (১০ আগস্ট)।

এদিন ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন রফিকুল।

সাক্ষ্য প্রদানকালে রফিকুল ইসলাম বলেন, জিয়াউল আহসান নিজ হাতে একজনকে মাথায় গুলি করে ব্রীজ থেকে পানিতে ফেলে দেন এবং অন্য কর্মকর্তাদেরও হত্যার নির্দেশ দেন। যারা নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করেন, তাদের ‘কাওয়ার্ড’ ও ‘স্টুপিড’ বলে গালমন্দ করেন তিনি।

ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে সাক্ষী রফিকুল ইসলাম আদালতকে জানান, ২০১১ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে একটি ‘সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে’র জন্য প্রস্তুত হতে বলেন।

রফিকুল ইসলাম তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমি স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কীসের অপারেশন, কোথায় যাবো? স্যার আমাকে বললেন, ‘তোমার কোনো কিছু জানার প্রয়োজন নাই। সময়মত আমার আদেশ মোতাবেক কাজ করবে।’

জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই রাত ১১টার দিকে রফিকুল ইসলাম তার তিন অফিসার- মেজর সাজ্জাদুল, মেজর তরিকুল এবং মেজর এমারতকে নিয়ে র‍্যাব সদরদফতরে পৌঁছান। সেখান থেকে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে চারটি গাড়ির একটি বহর টঙ্গীর আহসান উল্যাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হয়।

একটি ব্রিজের ওপর গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেন জিয়াউল আহসান। রফিকুল ইসলাম বর্ণনা করেন, ‘দেখতে পেলাম একটি গাড়ি থেকে একজন লোককে হাত এবং মুখ বাঁধা অবস্থায় ব্রিজের রেলিংয়ের পাশে দাঁড় করালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম জিয়াউল আহসান স্যার উক্ত ব্যক্তির মাথায় গুলি করেন এবং তাকে রেলিংয়ের উপর থেকে পানিতে ফেলে দেন।’

এর কিছুক্ষণ পর অন্য একটি ব্রিজে গাড়ি থামিয়ে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে নামানো হয়। রফিকুল ইসলাম জানান, জিয়াউল আহসান স্যার মেজর সাজ্জাদুলকে বলেন, ‘এখন আরও একটা সন্ত্রাস বিরোধী অপারেশন হবে সেটা তুমি করবে’। মেজর সাজ্জাদুল তখন জানতে চায়, ‘কে সন্ত্রাসী, কেন এই অপারেশন করবো?

জবাবে জিয়াউল আহসান তাকে নির্দেশ পালনের জন্য চাপ দেন। কিন্তু সাজ্জাদুল অপারগতা প্রকাশ করলে জিয়াউল আহসান ক্ষিপ্ত হন। রফিকুল ইসলামের বলেন, ‘জিয়াউল আহসান স্যার সাজ্জাদুলকে কাওয়ার্ড, স্টুপিড বলে গালমন্দ করেন এবং বলেন, ‘তুমি গিয়ে গাড়ীতে বসো। আমি তোমার কেইসটা সেপারেটলি দেখবো’।’ পরে ওই স্থান থেকে রফিকুল ইসলাম একটি গুলির শব্দ শুনতে পান।

তৃতীয় একটি স্থানে গাড়ি থামিয়ে আরেকজন ব্যক্তিকে বাঁশঝাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেও গুলির শব্দ পাওয়া যায় বলে জানান সাক্ষী। পরে মেজর তরিকুল তাকে জানান যে, তাকেও হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি তা পালন করেননি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরের দিন অফিসে গিয়ে মেজর সাজ্জাদুলের সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তনের আদেশ পাই। ৩/৪ দিন পর পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২/৩ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।’

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন জিয়াউলের আইনজীবী মো. সাহিদুর রহমান। সঙ্গে ছিলেন তার আইনজীবী নাজনীন নাহারসহ অন্যান্য আইনজীবী।

আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার মুখে সাক্ষী রফিকুল জানান, ওই রাতে তিনিসহ চারজন অফিসার সশস্ত্র থাকলেও জিয়াউল আহসানের নির্দেশেই তারা সেখানে গিয়েছিলেন।

জেরার এক পর্যায়ে আইনজীবী দাবি করেন, রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে শাড়ি ও আলু বোঝাই ট্রাক আটকের পর মালামাল বিক্রির অভিযোগ ছিল এবং জিয়াউল আহসান সেই তদন্ত করেছিলেন বলেই ক্ষোভ থেকে তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছেন। রফিকুল ইসলাম এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘জিয়াউল আহসান আমার বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করার কারণে আমি তার উপর ক্ষুব্ধ ছিলাম এবং ক্ষোভের কারণে অসত্য সাক্ষ্য দিলাম-ইহা সত্য নহে।’

এছাড়া মতিঝিলে ‘হুমায়ুন কবির ওরফে বিপ্লব’ এবং মালিবাগে ‘নাজিম উদ্দিন বাবু’ হত্যার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, একটি ঘটনা নিয়মিত টহলকালে গোলাগুলির ফল এবং অন্যটির সময় তিনি ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

আরএনবি/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর