নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার সংবাদ প্রচার করা টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বন্ধে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এমনকি কোনো চ্যানেল নির্দেশ অমান্য করলে সেটিকে ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ ঘোষণা করে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন আরাফাত।
সোমবার (১০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই নতুন কল রেকর্ডটি প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে।
ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার যুক্তিতর্কের চতুর্থ দিনে এই অডিও রেকর্ডটি উপস্থাপন করা হয়।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, কল রেকর্ডে ওবায়দুল কাদেরকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলতে শোনা যায়। তিনি নির্দেশ দেন যেন সংঘাতের কোনো খবর বা ফুটেজ প্রচার না করা হয়।
জবাবে মোহাম্মদ আলী আরাফাত জানান, ইতিমধ্যেই কিছু চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে যেন নির্দেশনা অমান্য করলেই সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া যায়।
কথোপকথনে আরাফাত আরও জানান, কারফিউর সিদ্ধান্তকে সুকৌশলে ‘জামাত-বিএনপির সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে এবং শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনার পথ খোলা রাখার বিষয়টি প্রচার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের জানান, তিনি দলীয় কার্যালয় থেকে ‘প্রস্তুত থাকা’ নেতাকর্মীদের ‘ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য’ পাঠিয়েছেন।
ঢাকা মেইলের হাতে আসা আরাফাত ও ওবায়দুল কাদের এর ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত সেই কথোপকথনটি হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো:
ওবায়দুল কাদের: এই যে যারা কথা শুনে না, এই যে টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
আরাফাত: ঐ যে অফ করে দিছি গতকাল দুয়েকটাকে। আজকেও বলে রাখছি, যেগুলো শুনবে না অফ করে দিতে সাথে সাথে।
ওবায়দুল কাদের: আজকে মারামারির খবর যেন না দেয়।
আরাফাত: আজকে, আজকেও ওদেরকে...
ওবায়দুল কাদের: সংঘাতের খবর যেন না দেয়।
আরাফাত: জি?
ওবায়দুল কাদের: আজকে যেন কোনো সংঘাতের খবর না দেয়।
আরাফাত: আজকে, আজকেও ওদেরকে বলছি, যে আজকে যদি কোনো ক্লাসের মারামারির ভিডিও ফুটেজ বা ছবি দেখায়, ওদেরকে এনিমি অব দ্য স্টেট হিসেবে ডিক্লেয়ার করা হবে এবং সারাজীবনের জন্য বন্ধ করে দিব। আমি এটা থ্রেট করে রাখছি আজকে। আর ঐ যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উনাকে বসায় রাখছি, যে আপনি কনস্ট্যান্টলি দেখবেন যে টিভি ক্লাসের ছবি দেখাবে, সাথে সাথে অফ করে দিবেন। আমার কোনো পারমিশনের জন্য মেসেজ পাঠাবেন না। আপনাকে ঢালাও পারমিশন দিয়ে রাখলাম। আর উইদাউট মাই পারমিশন ওটা অন করবেন না আর। এই ব্যবস্থা নিয়ে রাখছি কাদের ভাই আজকে।
ওবায়দুল কাদের: আর ওদিকে তোমরা আলাপ করে কী বুঝলে?
আরাফাত: আলাপ করে বুঝলাম যে নেত্রীকে এখন ব্রিফিং করার জন্য আসছি। উনি একটা ইনস্ট্রাকশন দিছেন। আলাপ করে আমার একটা ওপিনিয়ন আসছে, ওইটা আপনাকে আমি ব্রিফ করব কাদের ভাই।
ওবায়দুল কাদের: এখন কী অবস্থা?
আরাফাত: এখন অবস্থাটা হচ্ছে এরকম, যে কোটা আন্দোলনকারী বলে যেটা বলা হচ্ছিল, এটা দুই ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগ হলো কোটা আন্দোলনকারী স্টুডেন্ট, যাদের সাথে আমরা আলাপ করছি। আর একটা হলো তৃতীয় পক্ষ, অর্থাৎ জামাত-বিএনপি সন্ত্রাসীরা যারা পোড়াচ্ছে। সো কারফিউর ডিসিশন হচ্ছে, জামাত-বিএনপি সন্ত্রাসী যারা পোড়াচ্ছে তাদের বিপক্ষে, আর কোটা আন্দোলনকারী ছাত্রদের সাথে আমাদের ডিসিশন হচ্ছে আলোচনা করে সলভ সলিউশনে যাচ্ছি—এই হচ্ছে আমাদের ন্যারেটিভ এখন। এবং এটা তো সুন্দর ভাগ হয়ে গেছে কারণ...
ওবায়দুল কাদের: জি? এটা ঠিকই আছে। আজকে আলোচনা আছে?
আরাফাত: আপনি আসবেন কাদের ভাই ইয়েতে, গণভবনে?
ওবায়দুল কাদের: আজকে আলোচনা আছে? আমরা তো গণভবনে কালকে রাতে ২ টা পর্যন্ত...
আরাফাত: জি, জি। কালকে তো আপনার ইয়েটা দেখলাম, ব্রিফিংটা দেখলাম, জি। এখন আসছি ওই যে গতকালকের ডিসকাশনের পরে ঐ ব্রিফিং করার জন্য আসছি আরকি।
ওবায়দুল কাদের: হ্যাঁ, নেত্রীকে জানাও।
আরাফাত: জি, জি। আমি তাহলে কী ইয়ে করব?
ওবায়দুল কাদের: কোনো দরকার হলে আমাকে ফোন দিও। আমি এখন পার্টী অফিসে ছিলাম, ওখানে প্রস্তুত আছ দুই-তিন কোটি, পার্টি নেতাকর্মীরা ওগরে পাঠায়া দিলাম ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
আরাফাত: জি, জি। তাহলে আপনি কি বাসায় যাচ্ছেন? রেস্ট করার জন্য?
ওবায়দুল কাদের: আর ওদের চিকিৎসা-চিকিৎসা, খাওয়া-দাওয়া, এগুলোর ব্যবস্থা করতে হবে। জি।আরাফাত: আচ্ছা আচ্ছা, ও হ্যাঁ। দ্যাট'স গ্রেট।
ওবায়দুল কাদের: ঐজন্য নেত্রীকে জানাইও বিষয়টা।
আরাফাত: জি, আমি এটা তাহলে জানাচ্ছি কাদের ভাই।
ওবায়দুল কাদের: আচ্ছা ইয়া আসতেছে, বিপ্লব আসতেছে।
আরাফাত: ওকে, জি কাদের ভাই। আচ্ছা। জি, জি কাদের ভাই। থ্যাংক ইউ।
ওবায়দুল কাদের ছাড়াও এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান।
প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, বর্তমানে সাতজন আসামিই পলাতক।
এর আগে গত ৯ আগস্ট ওবায়দুল কাদেরের সাথে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি কল রেকর্ড জমা দেওয়া হয়, যেখানে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বর্তমানে মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে।
এর আগে গত ২ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
আরএনবি/এমআই