Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

আদালতের রায়ে পথ খুললেও কেন সংসদের দিকে তাকিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা?

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি

১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের মধ্য দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিলের রায় বহাল থাকলেও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসছে না। আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতা, যার সমাধান কেবল জাতীয় সংসদই করতে পারে।

সম্প্রতি আপিল বিভাগের রায়ের ফলে সংবিধানের ৫৮(ক) ও ৫৮(২ক) অনুচ্ছেদ (নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোটের বিধান পুনর্বহালের পথ সুগম হয়েছে। বাতিল হয়েছে সংবিধানের মৌলিক নীতি পরিবর্তনকে রাষ্ট্রদ্রোহ ঘোষণা করা ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদও।

অষ্টম সংশোধনী (হাইকোর্ট বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণ) বা ষোড়শ সংশোধনীর (সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল) ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের পরই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ, পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হয়নি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া আদালতে পুরো সংশোধনী বাতিলের আর্জি জানালেও আদালত তা গ্রহণ করেননি। ফলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা অন্তত ৪৮টি পরিবর্তন বহাল রয়েছে, যা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কার্যকরের ক্ষেত্রে অন্যান্য ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংশোধন করে অন্তত পাঁচটি জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শরীফ ভূঁইয়া বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার জন্য মোট আটটি ধারা ছিল। এর মধ্যে হাইকোর্ট দুটি ধারা বাতিল করেছেন, যা আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে। কিন্তু বাকি ছয়টি ধারা আদালত বাতিল করেননি। এই ছয়টি ধারা বাতিল না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ ব্যবস্থা চালু করা যাবে না। এখন সংসদকেই এসব ধারা বাতিল করতে হবে।

যেসব সাংবিধানিক গেরোয় আটকে আছে বাস্তবায়ন

আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়ার ব্যাখ্যা ও সাংবিধানিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিধানের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন আইনিভাবে আটকে আছে।

নির্বাচনের সময়সীমা ও সংসদ ভাঙার জটিলতা: ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে এবং তারা নির্বাচন পরিচালনা করবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১২৩(৩ক) অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছে, নির্বাচন হবে সংসদের মেয়াদ পূরণের আগের ৯০ দিনের মধ্যে।

এ বিষয়ে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ৯০ দিন আগে নির্বাচন হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে? বিধান হলো সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। এখন যদি সংসদ ভাঙার ৯০ দিন আগেই নির্বাচন হয়ে যায়, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ কোথায়?

প্রধান উপদেষ্টা পদে বিচারকদের নিয়োগে বাধা: ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা হবেন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বিভাগের বিচারপতি। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে ৯৯(১) অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছে, অবসরের পর বিচারকেরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।

এই প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টার পদও সরকারি পদ। আগে একটি ব্যতিক্রমী বিধান ছিল, যাতে এই নিষেধাজ্ঞা তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীতে সেই বিধানটি বাতিল করা হয়। আদালতও সেই বাতিলের বিধান বাতিল করেননি। ফলে আইনি বাধাটি বহাল রয়েছে।

শপথের বিধান উধাও: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টারা কীভাবে, কার কাছে এবং কোন ভাষায় শপথ গ্রহণ করবেন, তা সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে যুক্ত ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীতে এটি বাতিল করা হয়।

শরীফ ভূঁইয়ার ভাষায়, কে শপথ পড়াবেন, কীভাবে এবং কোন ভাষায় শপথ নেওয়া হবে, সেই বিধান পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়েছিল। আপিল বিভাগ বা হাইকোর্ট কেউই তা পুনর্বহাল করেননি। ফলে প্রধান উপদেষ্টার পদ থাকলেও শপথের বিধান ফিরে আসেনি।

পদমর্যাদা ও বেতন-ভাতা: ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় সংবিধানের ১৪৭ ও ১৫২ অনুচ্ছেদে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের পদ, মর্যাদা এবং বেতন-ভাতার সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। ২০১১ সালে তা বাতিল করা হয়। ফলে এসব বিধানও সংসদের মাধ্যমে পুনরায় সংযোজন করতে হবে।

সংসদে পাস হলেই কি সব সমাধান?

আদালত তার পর্যবেক্ষণে আগেই বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিমার্জন করতে পারবে।

তবে নির্বাচিত সংসদ সংবিধান সংশোধন করে এসব ত্রুটি দূর করলেও আইনি চ্যালেঞ্জের শঙ্কা থেকেই যায় বলে মনে করেন শরীফ ভূঁইয়া।

সংসদে সংশোধনী পাস হওয়ার পর এ নিয়ে আদালতে মামলা হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাস হওয়ার পর যে কেউ আদালতে মামলা করতে পারেন। তখন আদালতে কোন বিধান থাকা উচিত আর কোনটি নয়, তা নিয়ে আবার শুনানি হবে। এ কারণেই সংবিধান সংশোধনী নিয়ে আদালতে এত মামলা হয়।

তিনি আরও বলেন, সংসদ একটি সংশোধনী করবে, আদালত তা বাতিল করবে, এরপর তা ঠিক করতে আবার সংশোধনী হবে, আবার আদালত তা বাতিল করবে—এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে সংবিধান ক্রমেই দুর্বোধ্য হয়ে উঠবে। এই জটিলতা এড়ানোর লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই চার্টারের অধীনে সংবিধান সংস্কার সভার কথা বলা হয়েছিল, যাতে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে সংশোধনী আনা যায় এবং তা আদালতের এখতিয়ারের বাইরে থাকে।

সার্বিকভাবে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার নীতিগত বৈধতা ফিরে এলেও আগামী দিনে নির্বাচিত জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বিদ্যমান সাংঘর্ষিক বিধানগুলো দূর করতে হবে। অন্যথায় এ ব্যবস্থার কাঠামোগত ও আইনি বাস্তবায়ন জটিলতার মধ্যেই আটকে থাকবে।

আরএনবি/এআর