সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হলো বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদ চাইলে এই সরকার ব্যবস্থার কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করতে পারে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।
২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। এ ছাড়া সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ ছিল, একদলীয় শাসনের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে এবং জনগণকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করতে এই সংশোধনী আনা হয়েছিল। হাইকোর্ট সম্প্রতি এক রায়ে এই সংশোধনীর চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয় বাতিল ঘোষণা করে। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, গণভোটের অধিকার ফেরানো, সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব করার অপচেষ্টা বাতিল এবং ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের বিষয়টি ছিল।
তিনি জানান, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ চারজন ব্যক্তি ও দুটি সংগঠন আপিল করেছিল। তাদের দাবি ছিল— পুরো সংশোধনীটাই বাতিল করতে হবে। কিন্তু আপিল বিভাগ সেই আপিলগুলো খারিজ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়টিই বহাল থাকল।
সংসদের এখতিয়ার ও তত্ত্বাবধায়ক কাঠামো
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর জাতীয় সংসদ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগের কাঠামোতেই ফিরবে নাকি নতুন রূপ পাবে— এমন প্রশ্নের জবাবে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আদালতের রায়ে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সংশোধনীটি বাতিলই করা হয়নি, হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে সেটি পুনর্বহালও করা হয়েছে। সুতরাং আপিল বিভাগের এই রায়টি পূর্ণাঙ্গভাবে দেখলে এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পার্লামেন্টে আসার কথা।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমাদের বর্তমান সংসদ অত্যন্ত প্রাণবন্ত। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ আছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমাদের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন হওয়ার পর সংসদ যদি মনে করে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আগের কাঠামোটি আবারও পুনর্নির্ধারণ করবে, সেই ক্ষমতা তো পার্লামেন্টের আছেই। তবে পার্লামেন্টের কোনো সিদ্ধান্তই আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না, এটাই প্রত্যাশিত।
বাকি বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট চারটি বিষয়ের বাইরে সংশোধনীর বাকি বিষয়গুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। আমরা মনে করি, পার্লামেন্ট তাদের স্বীয় বুদ্ধিমত্তায় সংবিধানকে যুগোপযোগী করে তুলবে।’
ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘গ্যারান্টি’ দেওয়া যায় না
ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার এসে আবারও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করবে কিনা বা এর কোনো গ্যারান্টি আছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা পরিবর্তনশীল। যুগের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হয়। ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা বিবেচনা করে তো এখন সিল করে দেওয়া যাবে না। ভবিষ্যৎকে বাঁধার মতো কোনো আইনি মেকানিজম কারও হাতে নেই।’
সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘৭(খ) অনুচ্ছেদে বলা ছিল, ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু একটি পার্লামেন্ট সংশোধনী দিয়ে পরবর্তী সময়ে কী হবে না হবে, তা নির্ধারণ করতে পারে না। আদালত এই যুক্তি গ্রহণ করেই ওই সংশোধনী বাতিল করেছেন।’
ক্ষমতাসীন হওয়ার পর নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান সংশোধন করলে তা চিরস্থায়ী হয় না— এই রায়ের মাধ্যমে এমন বার্তা মিলল কিনা, এমন প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ইতিহাস তো তাই বলে। অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো কিছু করলে চূড়ান্ত বিবেচনায় তার সুফল পাওয়া যায় না; এর কুফলই ভোগ করতে হয়। এটা ইতিহাসের চরম সত্য।’
এফএ




