শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘রায় ঐতিহাসিক, তবে তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে সংবিধানে আছে স্ববিরোধিতা’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

‘রায় ঐতিহাসিক, তবে তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে সংবিধানে আছে স্ববিরোধিতা’
ব্রিফ করছেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের রায়কে ঐতিহাসিক বলে মন্তব্য করেছেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া।

তবে তার ভাষ্য, এ রায়ের ফলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কিছু আইনি ও টেকনিক্যাল জটিলতা বা স্ববিরোধিতা তৈরি হয়েছে, যার সুরাহা সংসদকেই করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে এবং প্রয়োজনে রিভিউ আবেদন করা হতে পারে বলেও জানান এ আইনজীবী।

রায়ের বিশ্লেষণ করে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, হাইকোর্টের রায়ে যেগুলো বাতিল হয়েছিল, সেগুলোই আপিল বিভাগের রায়ে বহাল থাকল। আপিল বিভাগ নতুন করে আর কোনো কিছুকে বাতিল করেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিধানগুলো বাতিল হয়েছে। তবে এখানে কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা আছে।

সংবিধানে স্ববিরোধিতা ও সাংঘর্ষিক নিয়ম

সংবিধানে একই সঙ্গে দুটি পরস্পরবিরোধী ধারা বহাল থাকায় যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দেন সুজনের এ আইনজীবী।

তিনি বলেন, হাইকোর্টের রায়ে সবগুলো বিধান বাতিল হয়নি, কিছু বিধান আরও বাতিল করা প্রয়োজন ছিল। যেমন—উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার শপথ গ্রহণ-সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে ফিরে আসেনি। বিচারপতিরা উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে পারবেন—এ বিষয়ে একটি বিধান ছিল, সেটিও ফিরে আসেনি।

সবচেয়ে বড় আইনি জটিলতার জায়গাটি তুলে ধরে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগেই নির্বাচন করতে হবে—পঞ্চদশ সংশোধনীর এ বিধান যদি বহাল থাকে, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, যেহেতু সংসদ ভেঙে দেওয়ার আগেই নির্বাচন করতে হচ্ছে, তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যা সংসদের মেয়াদ শেষে গঠিত হওয়ার কথা, তা গঠন করা যাচ্ছে না। কাজেই এখানে একটি বড় কন্ট্রাডিকশন বা স্ববিরোধিতা রয়েছে।

এ সংকট উত্তরণের পথ দেখিয়ে তিনি বলেন, এসব টেকনিক্যাল বিষয় এখন সংসদকে সুরাহা করতে হবে। যদি রায়ে এ বিষয়ে কোনো কিছু না থাকে, সে ক্ষেত্রে সংসদ ব্যবস্থা না নিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসায় নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন শরীফ ভূঁইয়া।

তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসছে। আপনারা জানেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় আমরা যে রিভিউ করেছিলাম, তাতে প্রতিকার পেয়েছি। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এলে দিনের ভোট রাতে হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। যদিও বাংলাদেশে অনেক কিছুই সম্ভব, যা আমরা কল্পনাও করি না।

মামলার আইনি যৌক্তিকতা ও দীর্ঘ লড়াইয়ের সফলতার কথা তুলে ধরে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একটি বৈধ ব্যবস্থা। এটি অসাংবিধানিক কোনো ব্যবস্থা নয়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছিল যে এ ব্যবস্থা বাংলাদেশের সাংবিধানিক শাসনের সঙ্গে পরিপন্থী।

তিনি বলেন, সে বিষয়ে আজ আমরা সর্বোচ্চ আদালত থেকে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা পেলাম যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা এবং এটি বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। কাজেই দুই বছর আগে আমরা পঞ্চদশ সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে যে মামলা শুরু করেছিলাম, আজ সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে তার একটি পরিণতি হলো।

জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ তৈরি হয়। তবে তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন রিটকারীরা।

পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এবং মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে পৃথকভাবে আপিল করেন।

গত সোমবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে এ মামলার শুনানি শুরু হয়। তিন দিনের শুনানিতে পক্ষগুলো তাদের মতামত তুলে ধরে।

যৌথ এ শুনানিতে রিট আবেদনকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি করেন শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শিশির মনির। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইমরান এ. সিদ্দিকী। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন শাহরিয়ার কবির।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং আরশাদুর রউফ।

আরএনবি/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর