নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ জুলাই ২০২৬, ০২:২৪ পিএম
সংবিধানে থাকা ‘সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ ও অপরিবর্তনযোগ্য বিধানকে ‘অদ্ভুত’ আখ্যায়িত করে আপিলকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, সংবিধান কোনো দণ্ডবিধি নয়।
একইসঙ্গে জাতির পিতার ছবি ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ অন্যান্য বিষয়গুলো নির্ধারণের ভার এখন জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি। এই মামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শিশির মনির।
সংবিধানে থাকা ‘সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ ও অপরিবর্তনযোগ্য বিধানকে একটি ‘উইয়ার্ড কনস্টিটিউশনাল প্রপোজিশন’ (অদ্ভুত সাংবিধানিক প্রস্তাবনা) বলে আখ্যায়িত করেন এই আইনজীবী।
তিনি বলেন, ‘সংবিধান কোনো পিনাল কোড (দণ্ডবিধি) না। আপনি একজনকে সাজা দেবেন, কাকে দেবেন না—এগুলো দণ্ডবিধির কাজ। পৃথিবীর কোনো সংবিধানে বলা থাকে না কাকে আপনি শাস্তি দেবেন আর কাকে দেবেন না। দণ্ডবিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহিতা একটা অপরাধ। কেউ তা করলে সরকারের অনুমতি নিয়ে তার বিচার হবে। সংবিধান তো কোনো বিচারের ডকুমেন্ট না; এটি হলো রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, তার দলিল।’
সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে না—এমন বিধানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে ২০ বছর বা ৫০ বছর পর নতুন জেনারেশন আসবে, দুনিয়ার হালত পরিবর্তন হবে। এইজন্য সংবিধানকে বলা হয় ‘লিভিং ডকুমেন্ট’। যুগ-জিজ্ঞাসার সঙ্গে এতে পরিবর্তন আনতে হয়। আমরা যদি বলি পরিবর্তন আনা যাবে না—এটা কি বাইবেল? এটা কি কোরআন? উত্তর হলো—না। এ কারণেই এই অংশটুকু বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।’
সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে শিশির মনির বলেন, ‘সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ রাষ্ট্রের পলিসি বা নীতির বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পরিপূর্ণভাবে সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদের দায়িত্ব অনেকাংশে বেড়ে গেছে।’
জাতির পিতার ছবি ও ‘বিসমিল্লাহ’ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সংবিধানে জাতির পিতার ছবির কথা ছিল। এছাড়া প্রস্তাবনায় সেক্যুলারিজমের (ধর্মনিরপেক্ষতা) জায়গায় ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ যুক্ত হয়েছিল। একইসঙ্গে সমিতি বা সংগঠন করার স্বাধীনতা পরিবর্তন করা হয়েছিল। এই বিষয়গুলো কী হবে, তা বর্তমান আদালত ঠিক করে দেননি; এটি জাতীয় সংসদ ঠিক করবে।’
জাতীয় সংসদকে ‘জুলাই চার্টার’ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টু-থার্ড (দুই-তৃতীয়াংশ) মেজরিটিতে বাকিগুলোকে পাস করবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে পাস করার ক্ষেত্রে তারা ‘জুলাই চার্টার’-এর বিষয়গুলোকে বিবেচনা করবে। কারণ জুলাই চার্টারে বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়েছিল এবং সেটি আমরা আপিল বিভাগেও দেখিয়েছিলাম।’
যে চারটি বিষয় বাতিল হলো
আপিল বিভাগের রায়ের ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট ব্যবস্থা ফিরে এসেছে জানিয়ে শিশির মনির বলেন, সুনির্দিষ্ট চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে সর্বোচ্চ আদালত। বাকি বিষয়গুলো মহান জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
রায়ে বাতিল হওয়া চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, আমাদের বর্তমান সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদে বলা ছিল—সংবিধানের কতগুলো বিষয় পরিবর্তন করা যাবে না। কেউ পরিবর্তন করলে সেটা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা। হাই কোর্ট বিভাগ একে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল, আপিল বিভাগেও এটি অসাংবিধানিক থেকে গেল।’
তিনি যুক্ত করেন, ‘দ্বিতীয়ত, হাই কোর্ট বিভাগ গণভোটের বিধানকে পুনঃপ্রবর্তন করেছিল। আপিল বিভাগের এই রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধানটি পুনঃপ্রবর্তিত হলো।’
তৃতীয় বিষয়টি নিম্ন আদালতের রিট ক্ষমতা সংক্রান্ত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। হাই কোর্ট এটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। আপিল বিভাগও সেটি বহাল রেখেছে। অর্থাৎ, হাই কোর্ট ডিভিশন ছাড়া আর কোনো আদালতে রিট আবেদন করার কোনো এখতিয়ার থাকবে না।’
সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘চতুর্থ বিষয়টি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করা হয়েছিল। হাই কোর্ট ওই বাতিলকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। আজকের রায়ের মাধ্যমে সেই বিষয়টাই বহাল থাকল। অর্থাৎ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসতে আর কোনো বাধা থাকল না।’
অপেক্ষার প্রয়োজন নেই
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ সংশোধনীর রিভিউ অ্যালাউ (মঞ্জুর) হয়েছে। অর্থাৎ ত্রয়োদশ সংশোধনী আবার ফিরে এসেছে, যেখানে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হেড (প্রধান) হওয়ার বিধান ছিল। এখন পার্লামেন্ট চাইলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর সঙ্গে যোগ-বিয়োগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া ঠিক করতে পারে। এতে কোনো আইনগত বাধা থাকবে না।’
আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে পূর্ণাঙ্গ রায়ের প্রয়োজন হবে বলে আমি মনে করি না। কারণ, আপিলটা ডিসমিস (খারিজ) হয়ে গেছে। এর মানে হলো হাই কোর্ট ডিভিশনের জাজমেন্টটাই বহাল আছে। হাই কোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি আমাদের কাছে আছে। আপিলটি ‘ডিসপোজড অব’ হলে বা আদালত কোনো ‘অবজারভেশন’ দিলে অপেক্ষার প্রয়োজন হতো। যেহেতু আপিল খারিজ হয়েছে, তাই আইন মন্ত্রণালয় বা সংসদের সামনে পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করার কোনো দরকার নেই।’
আরএনবি/এমআই