আমিনুল ইসলাম মল্লিক
২১ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:১৮ পিএম
অন্তর্বর্তী সরকার অন্যান্য অঙ্গনে সংস্কারের ধারাবাহিকতায় বিচার বিভাগের সংস্কারেও উদ্যোগ নিয়েছে। সে লক্ষ্যে গঠিত কমিশন ইতোমধ্যে সরকারের কাজে প্রাথমিক সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগে বয়স বাড়ানো, জেলা আদালতের মামলা জট দূর করতে চুক্তিভিত্তিক বিচারক নিয়োগ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রতি তিন বছর পরপর দাখিলসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন।
সংস্কার কমিশনের এসব সুপারিশের কোনো কোনোটি নিয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন আইনজ্ঞরা। বিশেষ করে বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের কেউ কেউ। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রতি তিন বছরের পরিবর্তে প্রতি বছর দাখিলের পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। এছাড়া সংস্কারের মহাপরিকল্পনা নিতে আদালতে নিয়মিত প্র্যাকটিশনারদের পরামর্শ নেওয়ার তাগিদও রয়েছে আইনজ্ঞদের।
সংস্কার সুপারিশ নিয়ে কী বলছেন আইনজ্ঞরা
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বয়স ৭০ করার সুপারিশের বিপক্ষে মত দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ঢাকা মেইলকে বলেন, বিচারকদের অভিজ্ঞতার দরকার আছে। তার মানে এই না যে, ৭০ বছর বয়সী মানুষদের নিয়োগ দিতে হবে। এত বছর বয়সে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। খিটখিটে মেজাজ নিয়ে বিচার করতে সমস্যা হতে পারে।
তার মতে, এই বয়সের বিচারকদের নিয়োগ দিলে সমস্যা বাড়বে। নতুনদের বিচারক হিসেবে আসতে সমস্যা হবে। শুধু তাই নয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বয়স ৭০ বছর করলে অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীরাও তাদের বয়স বাড়ানোর দাবি তুলতে পারেন। এমনটা করলে এটা বৈষম্য হবে।
খোকন বলেন, এমনিতেই বাংলাদেশের মানুষ বেকার। আমার মনে হয়, আমাদের এই উপমহাদেশে বিচারকদের বয়সসীমা যা আছে তাই থাকা উচিত। বয়স বাড়লে বিচারকদের সম্মানহানি হতে পারে। এতে করে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এবিএম আলতাফ হোসেন বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোয় সমস্যা দেখছেন না। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রস্তাবটা ভালো। একজন বিচারপতির বয়স ৭০ করা হলে খারাপ হবে না, ভালোই হবে। জেলায় বিচারকদের চুক্তির বিষয়টি খারাপ না। তবে নতুন করে উঠে আসার ক্ষেত্রে যেন বাধার সৃষ্টি না হয়। বিচার বিশ্লেষণ করে এসব করা যেতে পারে।
এই আইনজ্ঞ মনে করেন, ন্যায়বিচার নির্ভর করবে বিচারকের যোগ্যতার ওপর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমৃত্যু বিচার করার অধিকার রয়েছে। ভারতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্টের বিচারকদের বয়স ৬২ বছর। আর সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বয়স নির্ধারণ করা আছে ৬৫ বছর।
সম্পদের হিসাব দাখিল প্রসঙ্গে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, এটা তো প্রধান বিচারপতি নির্দেশ দিলেই হয়। বিচার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিসাবের তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা যায়। এটা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের প্রয়োজন নেই।
মনজিল মোরসেদ বলেন, শুধু জেলা ও দায়রা জজ আদালতের মামলা জট কমাতে চুক্তিভিক্তিক বিচারক নিয়োগ দিতে সুপারিশ করলেই হবে না। সুপ্রিম কোর্টেও অনেক মামলা জট আছে। সেগুলোও সমাধানের জন্য বিচারক নিয়োগ দেওয়ার দরকার আছে। তাছাড়া এখানে মামলা জট কমবে না।
সংস্কার প্রস্তাবের সমালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের এই সিনিয়র আইনজীবী বলেন, সংস্কারের প্রস্তাব খুব ভালো মনে হয়নি আমার কাছে। সুপ্রিম কোর্টে যারা নিয়মিত প্র্যাকটিস করেন তাদের পরামর্শ নিয়ে বিচার বিভাগের সংস্কারে হাত দিতে হবে। এখানকার আইনজীবী বিচারক ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে কাজ করতে হবে। যারা নিয়মিত কোর্ট করেন তারাই সমস্যার কথা জানেন। বাইরের লোক জানবেন কীভাবে?
মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, বিচার বিভাগ সংস্কার করতে একটা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। সরকারের চিন্তা করতে হবে, বিচার বিভাগ ঠিক না হলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। যথাযথ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কারে হাত দিতে হবে। তাহলে কাজটা ভালো হবে।
কী আছে সংস্কার কমিশনের সুপারিশে
গত ১৪ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারকদের অবসরের বয়স ৭০ বছর করার প্রস্তাব করে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। এজন্য বিদ্যমান সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান সংবিধানে প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর নির্ধারণ করা রয়েছে। এই অবসরের বয়সসীমা তিন বছর বৃদ্ধি করে ৭০ করার প্রস্তাব করে কমিশন।
এছাড়া মামলা জট নিরসনে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের মধ্যে যারা সৎ, দক্ষ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তাদের দুই-তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশন বলছে, অধিকসংখ্যক ফৌজদারি আপিল ও রিভিশন, দেওয়ানি আপিল ও রিভিশন নিষ্পন্নাধীন রয়েছে, এরূপ জেলাসমূহে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের নিয়োগ করা যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে বিচার প্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষত বিচারক, ফৌজদারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এবং প্রসিকিউটর এবং বিচারাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বিচার বিভাগের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন, বিচার বিভাগের যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ করা, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করেছে কমিশন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই সুপারিশ সংক্রান্ত খসড়া প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছেন বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান ও কমিশনের সদস্যরা। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছে সরকার।
খসড়া সারসংক্ষেপে কমিশন বলছে, বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে প্রতি তিন বছর পরপর সুপ্রিম কোর্ট এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের সম্পত্তির বিবরণ সুপ্রিম কোর্টে প্রেরণ এবং তা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করতে হবে। ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণীও। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সমন্বয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তদন্তে অভিযুক্ত বিচারকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বা অন্যবিধ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া গ্রাম পর্যায়ে ছোট ছোট বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয়ভাবে কার্যকর বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি প্রবর্তন জরুরি। প্রয়োজনে লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে চালু থাকা গ্রাম আদালতের আমূল সংস্কারের মাধ্যমে বিচারকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর আগে গত ৩ অক্টোবর গেজেট জারির মাধ্যমে আট সদস্যবিশিষ্ট বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গঠন করে দেয় সরকার। বিচার বিভাগকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করার দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিশনকে।
এআইএম/জেবি