images

সাক্ষাৎকার

‘কঠোর শাস্তি না হওয়া ও বিচার বিলম্বে দেশে বাড়ছে ধর্ষণ’

আব্দুল কাইয়ুম

০৬ মার্চ ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

দেশে ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলছে। নারী থেকে শিশু কেউই রেহাই পাচ্ছে না অপরাধীদের হাত থেকে। প্রান্তিক পর্যায়ে ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের সালিশের নামে হুমকি ও প্রলোভন দেখিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখছে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এসব ঘটনা প্রতিরোধে সমাজ, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা ভূমিকা নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের নিজস্ব প্রতিবেদক একে সালমান (আব্দুল কাইয়ুম)

‎ঢাকা মেইল: সম্প্রতি দেশে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা উদ্বেগ হারে বেড়ে গেছে। এর পেছনে কী বলে আপনি মনে করেন?

তৌহিদুল হক: দেশে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা যে পরিমাণ বাড়ছে, এটি নতুন আতঙ্ক বা উদ্বেগ তৈরি করছে। প্রথমত, ধর্ষণ করা হচ্ছে, আবার ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে। ধর্ষণের পর হত্যার মূল কারণটা হলো- ভুক্তভোগী যেন অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ করতে না পারে কিংবা আইনগত কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারে। পাশাপাশি, ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর যেন কোনো আলামত না থাকে।

‎এখন প্রশ্ন হলো- একটি সমাজে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ে কেন? একটি সমাজে যখন নারী-পুরুষের নাগরিক হিসেবে যথাযথ মর্যাদার প্রশ্ন আসে, এই প্রসঙ্গগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত একটি সমাজে পূর্ণমাত্রায় চর্চা এবং প্রতিষ্ঠিত না হয়, সেই সমাজে ধর্ষণ বা নারী অথবা কন্যা শিশুর প্রতি নানা ধরনের সহিংসতা বাড়ে। এ ধরনের ঘটনাগুলোতে ধর্ষণ এবং অন্যান্য যে সহিংসতার প্রশ্ন আসে, সে প্রশ্নগুলোতে অতীতে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সে ঘটনাগুলোতে যথাযথ বিচারের ক্ষেত্রে বিলম্বিত বিচার প্রসঙ্গ রয়েছে। বিচারের আগে যে তদন্ত হয়, সে তদন্ত যথাযথভাবে হয় কি না, সেটা নিয়ে একটি সমালোচনা আছে। এরপর বিচারকে প্রভাবিত করার অভিযোগ আছে। এ প্রসঙ্গগুলো আমাদের দেশে ধর্ষণের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করে। যারা ধর্ষক, যারা একক অথবা দলবদ্ধভাবে কাজগুলো করে থাকে, তাদের মধ্যে একটা জিনিস কাজ করে যে, এ কাজগুলো করার পর তারা আইনগতভাবে পার পেতে পারেন কি না কিংবা এ কাজগুলো করার পর আইনগতভাবে ভুক্তভোগীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন কি না। এ প্রসঙ্গগুলো এ ধরনের অপরাধীদের মধ্যে কাজ করে।

‎এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যেখানে প্রান্তিক পর্যায়ে নারী কিংবা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, কিন্তু ধর্ষকের কোনো কিছুই হয়নি। ভুক্তভোগীকে হুমকির কিংবা সালিশ করে দেওয়ার নামে জোরপূর্বক ক্ষতিপূরণ দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। আবার আইনগত ব্যবস্থার জন্য অভিযোগ বা মামলা করলেও তা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গগুলো মূলত একটি সমাজে অপরাধ বাড়ার জন্য সহায়তা করে। যার কারণে ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটছে।

‎ঢাকা মেইল: ধর্ষণের ঘটনাগুলো সমাজে কোন ধরনের প্রভাব ফেলে?

তৌহিদুল হক: আমরা বিগত দিনে দেশে যেসব ধর্ষণের ঘটনা দেখেছি; বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনায় যারা ভুক্তভোগী হয়েছে, সেগুলোতে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ প্রান্তিক পর্যায়ের নারী ও কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যার অধিকাংশ আর্থিক টানাপোড়েন, সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এবং অনগ্রসর পরিবারের নারী। তাদের ধর্ষণের পর যথাযথ বিচার কিংবা সামাজিক প্রতিবাদ অথবা প্রতিরোধ জোরালোভাবে হয় না। এসব প্রক্রিয়া জোরালোভাবে না হওয়ার ফলে সমাজের নারী কিংবা সব শ্রেণির মানুষ আর কোনো বিচার পায় না। যার কারণে সমাজে নারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। এই নিরাপত্তাহীনতা কিন্তু দেশের সব নারীর ওপর প্রভাব ফেলে। তখন নারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

‎আরেকটা কারণ হলো, ভুক্তভোগী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর তাদের  উল্টো ধর্ষণের জন্য দোষারোপ করা হয়। আমাদের সমাজে ধর্ষিতাকে দোষারোপ করার জন্য এমন কিছু দোষ সামনে নিয়ে আসা হয়, যার কারণে তারা ভয়ে বিচার চাওয়া কিংবা সামাজিক অবস্থান থেকে নীরবে দূরে সরে যায়। যেমন, নারী তখন এ অবস্থায় কেন ছিল, ওই সময় কেন সেখানে গেল, ওই পোশাকে কেন? এমন থাকলে এরকম ঘটনা ঘটতেই পারে। এসব কথা আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি ছড়ানো হয়। মূলত, ধর্ষণের ঘটনাকে জায়েজ করার জন্য এমন নানা ধরনের ব্যাখা বিশ্লেষণ দাঁড় করানো হয়। সে ভয় সব নারীকে আক্রান্ত করে। তখন সামাজিক শক্তির প্রতি মানুষের একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। যার ফলে সামাজিকভাবে দূরত্বের জায়গা তৈরি হয়ে সমাজে ভয়াবহ প্রভাব সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন

যৌথ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতায় ঠুনকো কারণে বাড়ছে তালাক!

সংরক্ষণে নেই তথ্য, অপরাধ করেও নাগালের বাইরে গৃহকর্মীরা!

‎ঢাকা মেইল: বর্তমানে সবচেয়ে বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা পর্যন্ত করা হচ্ছে। এমন ঘটনা রোধে কী করণীয়?

তৌহিদুল হক: দেশে শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, এটি আরও বেশি উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশে শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ সম্পর্ক তৈরি হয়নি। শিশুকে খুব সহজে সব কাজের বলি বানানো যায়। শিশুরা মূলত অপরাধীদের সাথে মোকাবেলা করার শক্তি না থাকায় কিংবা তাদের খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে খুব সহজে ডাকা যায়। অপরাধীরা এ সুযোগটা কাজে লাগায়। শিশুকে ধর্ষণের পর শিশু যেন কাউকে বলতে না পারে সেজন্য তাকে গলাকেটে হত্যা করা হয় কিংবা হত্যার পর নির্মমভাবে টুকরো করা হয়। আমাদের দেশে মূলত নারীদের এখনো যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সে জায়গাটায় এখনো তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ পরিবর্তন না হওয়ার কারণে অতিমাত্রায় যারা যৌনতা নিয়ে চিন্তা করে, তারাই সমাজে এই স্ত্রীলিঙ্গের প্রতি আক্রোশ মিটাতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

‎এছাড়াও, নারী ও কন্যা শিশুকে নির্যাতনের সময় তারা পুরুষের সঙ্গে শারীরিকভাবে শক্তি দিয়ে না পারায় এই সুযোগটা অপরাধীরা কাজে লাগাচ্ছে। এ কাজগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের যে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটা না নেওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করে না। যার ফলে এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।

Rape
দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ছবি: সংগৃহীত

‎ঢাকা মেইল: বয়স্ক নারী, শিশু কেউ অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। অপরাধীরা গ্রেফতার হচ্ছে, তাদের সাজা হচ্ছে। তবু নৈতিক অধঃপতন কেন?

তৌহিদুল হক: অপরাধীরা গ্রেফতার হচ্ছে, সাজা পাচ্ছে, আবার এ ঘটনাগুলো অন্য ঘটনার আড়ালে মানুষ ভুলে যাচ্ছে। এমন লোমহর্ষক ঘটনায় সাজাটা পরিপূর্ণ হচ্ছে না। আইন বলছে, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ পর্যন্ত কতজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে? ধর্ষণের ঘটনার কতদিন পরে এসে বিচার হচ্ছে? এসব অপরাধের বিচার ছয় মাসের মধ্যে করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক মূল্যবোধের আলোকে মানুষের জীবনাচরণ তৈরি করা সবার প্রত্যাশা। কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, যারা সমাজে শক্তি দেখিয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, এসব মানুষের বেশির ভাগই সামাজিক মূল্যবোধ মেনে চলতে চায় না। তারা নিজেদের মতো করে এককভাবে সমাজে প্রভাব বিস্তার করে প্রসঙ্গ তৈরি করে। সেগুলো দিয়ে সমাজে তারা প্রভাব বিস্তার করে।

‎এ ধরনের প্রসঙ্গগুলোতে যারা আমাদের সমাজে শিক্ষিত বা সামাজিক মূল্যবোধকে মূল্যায়ন করে, তাদের প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা আমাদের সমাজে তাদের খুব বেশি একটা দেখি না। একটা ঘটনা ঘটলে দেখা যায়, যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হন, মানুষ মনে করে যার সঙ্গে এ ঘটনা ঘটেছে, এটা তার বিষয়। আমরা এগিয়ে গেলে আমরাই বিপদে পড়তে পারি। এমন ঘটনায় সামাজিক মূল্যবোধ পিছিয়ে পড়ে, অপরাধীরা এগিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

পুলিশের জালে হানি ট্র্যাপের হোতারা!

সিসা বার ঘিরে আলোর আড়ালে অন্ধকার এক জগৎ

‎ঢাকা মেইল: এমন লোমহর্ষক ঘটনাগুলোতে সরকারের করণীয় কী? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সমাজের ভূমিকা কী হতে পারে?

তৌহিদুল হক: একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের সর্বোচ্চ অভিভাবক সরকার। সরকারের কাছে সব নাগরিক সমান। সরকারের কাজ নিরপেক্ষ তদন্ত করা, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করা। কারণ হচ্ছে, একটি অপরাধের বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে না হলে সমাজে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, অপরাধ করে টিকে থাকা যায়। সমাজে অপরাধ করলে কিছু হয় না। দীর্ঘ সময় নানাভাবে সমাজে অপরাধ ঘটেছে। যথাযথ ব্যবস্থার প্রসঙ্গে এসে আমাদের হোঁচট খেতে হয়েছে। আমরা যদি যথাযথভাবে আইগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতাম, সামাজিক প্রতিরোধের সময় যদি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত, তখন এ অবস্থাগুলো এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করতো না। এছাড়াও, এ ধরনের অপরাধ পরিচালনার প্রশ্নে আইন প্রয়োগ ও তদন্তের জায়গাগুলোতে অতীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল।

‎একজন ধর্ষক কিংবা অপরাধ সৃষ্টিকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের জায়গাটায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্তভাবে, পেশাদারিত্ব বজায় রেখে, আইনি বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে প্রয়োগ করবে। এ জায়গাতে কোনো ধরনের প্রভাবের জায়গা যেন তৈরি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষগুলো অপরাধের শিকার হওয়ার পর সমাজের মানুষগুলো যেন যথাযথ বিচার পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ‎এ আয়োজন তো একদিনে হবে না। এটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। এ নিয়ে সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন এবং ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োগ করে একটি নিদর্শন তৈরি করতে হবে। তাহলে আমাদের সমাজে অপরাধের সংখ্যা কমে যাবে।

‎‎একেএস/জেবি