Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

শান্তিতে নোবেলজয়ী কে এই নাভি পিল্লাই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যতম পরিচিতি মুখ।

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যখন আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, তখন শান্তি প্রতিষ্ঠায় আইনের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হলো নাভি পিল্লাইকে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তার নাম ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। 
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের সময় আইন পেশায় যুক্ত হয়ে অধিকারবঞ্চিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন—পিল্লাইয়ের কর্মজীবন বিস্তৃত কয়েক দশকজুড়ে। বিশেষ করে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, সংঘাতের মধ্যে যৌন সহিংসতা এবং নারীর অধিকার নিয়ে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কে এই নাভি পিল্লাই

তার দাফতরিক নাম নাভানেথেম পিল্লাই হলেও নাভি পিল্লাই নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের ক্লেয়ারউডে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে ঘর আলো করে তিনি ধরণীতে এসেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠা পিল্লাই নিজের কর্মজীবনে নিয়মিত জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি ইউনিভার্সিটি অব ন্যাটাল থেকে ১৯৬৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা তার পেশাগত অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

১৯৬৭ সালে ন্যাটাল প্রদেশে নিজের আইন চেম্বার প্রতিষ্ঠা করেন পিল্লাই। দক্ষিণ আফ্রিকার ওই অঞ্চলে আইন পেশায় নিজস্ব চেম্বার প্রতিষ্ঠাকারী প্রথম নারী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। একই সময়ে দেশটির হাইকোর্টে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবেও ইতিহাস গড়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মী ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন পিল্লাই। তার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কাজ করার ভিত্তি তৈরি করে।

রুয়ান্ডায় গণহত্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

নাভি পিল্লাইয়ের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ে রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত সেই গণহত্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন। ওই ঘটনার দায়ীদের বিচারের জন্য জাতিসংঘ ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা’ গঠন করে।

১৯৯৫ সালে পিল্লাই এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সালে তিনি ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পান। তিনি মোট আট বছর ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করেন, এরমধ্যে চার বছর ছিলেন প্রেসিডেন্ট।

রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আকায়েসু মামলা। এই মামলায় জ্যঁ-পল আকায়েসুর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচার হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের ইতিহাসে এই রায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে ধর্ষণকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যা সংঘটনের উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

এ ছাড়া রুয়ান্ডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ কামবান্দার মামলাও ছিল ঐতিহাসিক। গণহত্যায় ভূমিকার দায় স্বীকারের পর তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কোনো সরকারপ্রধানকে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করার প্রথম নজির ছিল এটি।

এই বিচারপ্রক্রিয়াগুলোর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে দায়মুক্তি রোধ, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সংঘাতের সময় সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের গুরুত্ব সামনে আসে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারক

রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালে কাজ করার অভিজ্ঞতার পর ২০০৩ সালে পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক নির্বাচিত হন। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করে।

আইসিসিতে দায়িত্ব পালনের সময় পিল্লাই আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন, মানবিক আইন এবং মানবাধিকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে সশস্ত্র সংঘাতে যৌন সহিংসতার মতো অপরাধের বিচার ও স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার কেবল অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত। পিল্লাইয়ের কর্মজীবনে এই বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান

২০০৮ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব মনোনীত হওয়ার পর সাধারণ পরিষদ পিল্লাইকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব হলো বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়নের প্রচেষ্টা জোরদার করা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা এবং সংশ্লিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণে সহায়তা করা।

এই দায়িত্বে থেকে পিল্লাই বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বৈষম্য, নির্যাতন, আটক ব্যক্তিদের অধিকার, নারীর অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার মতো বিষয়সমূহ নিয়ে কাজ করেন। তার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদান

পিল্লাইয়ের কাজ শুধু আদালত ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৮৫ সালে তিনি আন্তর্জাতিক নারী অধিকার বিষয়ক সংগঠন ইকুয়ালিটি নাউয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন।

সংগঠনটি নারী ও মেয়েশিশুর অধিকার রক্ষা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে কাজ করে। পিল্লাইয়ের দীর্ঘ আইন পেশার অভিজ্ঞতায় নারীর প্রতি সহিংসতা, সংঘাতের মধ্যে যৌন নিপীড়ন এবং বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারেও নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে যুদ্ধ ও সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতার বিচারকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালের অভিজ্ঞতা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

কেন তাকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হলো

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির ঘোষণার বিষয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য পিল্লাইকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠাকে সাধারণত যুদ্ধবিরতি, কূটনৈতিক আলোচনা বা সংঘাতের অবসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অপরাধের বিচার, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার বিষয়টিও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।

নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবনে এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনজীবী হিসেবে কাজ করা, গণহত্যার বিচারে অংশ নেওয়া, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দায়িত্ব পালন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি আইনের শাসন ও মানবাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

এপি প্রকাশিত প্রতিবেদনে নোবেল কমিটির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠান ও বিচারকদের ওপর রাজনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে শক্তি প্রয়োগের বদলে আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে এ পুরস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পুরস্কারের অর্থমূল্য ও প্রদান

২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। রয়টার্সের হিসাবে, এর পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার।

প্রথা অনুযায়ী, ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক এই আয়োজনের মহাসমারোহ চলছে নরওয়ের অসলোতে।

নাভি পিল্লাইয়ের স্বীকৃতির তাৎপর্য

নাভি পিল্লাইয়ের নোবেলজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরে— শান্তি শুধু সংঘাত থামানোর নাম নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং অপরাধের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও বিষয়।

বর্ণবৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করা পিল্লাই পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও মানবাধিকার সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কর্মজীবন দেখিয়েছে, আইন ও বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী হলে সংঘাতের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ বাড়ে।

তবে আন্তর্জাতিক আইন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং অপরাধে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার বাস্তব সক্ষমতার ওপর। সেই কারণে পিল্লাইয়ের স্বীকৃতির তাৎপর্য শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), জাতিসংঘ

এফএ