আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এরমধ্যেই মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বিষয়টিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি ‘পরীক্ষা’ হিসেবে তুলে ধরেছে এবং বিশেষভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য জটিলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি মূলত জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব ও কূটনৈতিক স্বাধীনতার।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো যদি একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলে, তাহলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয় এবং বিষয়টিকে ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখছে।
পৃথক ভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, সৌদি আরব ঢাকাকে এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তবে আমন্ত্রণটি কখন জানানো হয়েছে তা জানায়নি।
যদিও এ বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হলে ঢাকায় অবস্থিত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দূতাবাসগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
প্রসঙ্গত, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ হলো— সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তি। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় এই তিন দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব—সৌদির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এই চুক্তির প্রধান শর্ত হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে বাকি দুই দেশ তাকে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা দিতে বাধ্য থাকবে, যা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ‘আর্টিকেল-৫’ এর মতো একটি যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এই জোটে যোগদানের কোনো আনুষ্ঠানিক বা চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বর্তমানে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে সম্ভাব্য অংশগ্রহণ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো— নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক কর্মরত— বিশেষ করে সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
এই বাস্তবতায় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কিছু সুবিধা পেতে পারে। এছাড়াও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময়, সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা বাস্তবতা শুধু স্থলসীমান্তকেন্দ্রিক নয়। বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রবন্দর, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নীতিগতভাবে অস্বাভাবিক কোনো ধারণা নয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে তুলে ধারা হয়েছে, বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের ওপর ‘কোন পক্ষের সঙ্গে আছে’—এই প্রশ্নের চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন একটি বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এসেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থটি। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে বিভিন্ন কারণে সংবেদনশীল এবং পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো সামরিক কাঠামোতে বাংলাদেশের প্রবেশকে নয়াদিল্লি স্বাভাবিকভাবে ইতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে।
এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির বহুস্তরীয় সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ঢাকার কোনো সামরিক সিদ্ধান্তের প্রভাব দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ওপর পড়বে—এটি বাস্তব কূটনৈতিক হিসাব।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ভিত্তি শুধু ‘ভারত কী ভাববে’—এমন হওয়াও সমানভাবে অনুচিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হওয়া উচিত বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ভিত্তিতে।
রয়টার্সকে দেওয়া মন্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহানও একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরে বলেছেন, মক্কা চুক্তিতে যোগদানে কোনো কোনো দেশ অসন্তুষ্ট হতে পারে, কিন্তু সেটি বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।
অনান্য বিশ্লেষকদের মতেও, বাংলাদেশের সামনে সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো সীমিত ও শর্তযুক্ত কৌশলগত সম্পৃক্ততা। অর্থাৎ, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে; কিন্তু আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার আগে জাতীয় স্বার্থের ওপর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সেক্ষেত্রে প্রথমত, চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলো প্রকাশ্য ও স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক নীতি এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক অবস্থানের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে আবেগ, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা ভারতবিরোধিতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা উচিত নয়। একইভাবে এটিকে কেবল ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য সংকট হিসেবেও দেখা উচিত নয়। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গেও বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক পরিচালনা করা বাংলাদেশের অধিকার।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কৌশলগত ভারসাম্য। সেই ভারসাম্য নষ্ট না করে যদি মক্কা চুক্তির সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য অধিক লাভজনক পথ।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনের সতর্কবার্তাটিও পুরোপুরি অগ্রাহ্য করারও সুযোগ নেই। একটি সামরিক জোটে প্রবেশের সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি এবং এর প্রভাব শুধু প্রতিরক্ষা খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে কোনো তাড়াহুড়ো না করে, দেশের সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ লাভ-ক্ষতির হিসাব করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমএইচআর