Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলো কি বিভক্ত লিবিয়াকে এক করতে পারবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম

মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পরও এক হয়নি লিবিয়া। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও সংঘাতে একসময় আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশটি আজ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। দীর্ঘদিন ধরে কার্যত দুই প্রশাসনে বিভক্ত দেশটিকে আবার এক করার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, মিসর ও কাতার। তাদের লক্ষ্য ‘এক লিবিয়া’। কিন্তু দেড় দশকের এই বিভাজন কি সত্যিই কাটিয়ে উঠতে পারবে আফ্রিকার দেশটি?

১৫ বছর আগে কী ঘটেছিল?

১৯৬৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। পরবর্তী চার দশকেরও বেশি সময় তিনি কার্যত দেশটির একচ্ছত্র শাসক ছিলেন। তেলসম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করায় একসময় লিবিয়া আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন ও পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত তার শাসনকে বিতর্কিত করে তোলে।

২০১১ সালের শুরুর দিকে আরব বসন্তের ঢেউ শুরু হয়। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিউনিসিয়া, মিসরের প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলে। তিউনিসিয়ায় জাইন আল-আবিদিন বেন আলী ও মিসরে হোসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হন। এ সময়েই বেনগাজি শহরে ছড়িয়ে পড়ে গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ। বিক্ষোভ দমনে গাদ্দাফি বেছে নেন সহিংস উপায়। গোলাবারুদ, যুদ্ধবিমান দিয়ে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেন। গাদ্দাফি সরকারের অনেক মন্ত্রী এই পদক্ষেপের প্রতিবাদ করেন।

বিক্ষোভ যত জোরালো হতে থাকে, পদত্যাগ করার জন্য গাদ্দাফির ওপর পশ্চিমাদের চাপ তত বাড়তে থাকে। গাদ্দাফি ও তার বাহিনীও প্রতিরোধ শুরু করে। গৃহযুদ্ধ বাধার পরপরই জাতিসংঘ গাদ্দাফিবিরোধী ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এনটিসি) সমর্থন দেওয়া শুরু করে। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশ এতে মদদ জোগায়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সমর্থনে এনটিসি লিবিয়ায় আক্রমণ শুরু করে।

gaddafi
লিবিয়ায় টানা ৪২ বছর শাসনক্ষমতায় ছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি

এভাবে এনটিসিই হয়ে ওঠে লিবিয়ার অঘোষিত সরকার। ২০১১ সালের আগস্টে বিদ্রোহী বাহিনী ত্রিপোলিতে ঢুকে পড়ে। শহরের বেশিরভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। ২৩ আগস্ট তারা ত্রিপোলিতে গাদ্দাফির সদর দপ্তর আল-আজিজিয়া কম্পাউন্ড দখল করে। শুরু হয় গাদ্দাফির খোঁজ। গাদ্দাফি বাহিনীও প্রতিরোধ চালাতে থাকে।

রাজধানী ত্রিপোলির পতনের পর, সিয়ার্ত শহরে গাদ্দাফির অনুগত বাহিনী শেষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই শহরেই ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় গাদ্দাফিকে।

যেভাবে বিভক্ত হলো লিবিয়া?

গাদ্দাফির মৃত্যুর পর দেশটিতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। বিভিন্ন গোষ্ঠী ও তাদের মিত্র মিলিশিয়ারা ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় নামে।

বর্তমানে দেশটির নিয়ন্ত্রণ মূলত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসনের মধ্যে বিভক্ত। একটি হলো জাতিসংঘ-স্বীকৃত গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি (জিএনইউ)। রাজধানী ত্রিপোলিভিত্তিক এই সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দেইবাহ। অন্যটি পূর্বাঞ্চলের তব্রুকভিত্তিক প্রশাসন, যার সমর্থনে রয়েছেন খলিফা হাফতার ও তার নেতৃত্বাধীন স্বঘোষিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ)।

জিএনইউ জাতিসংঘ ও অন্যান্য দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং রাজধানীসহ পশ্চিম লিবিয়ায় আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব রয়েছে।

গাদ্দাফির শাসনামলে হাফতার দুই দশক যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ছিলেন। সেখানে তিনি নাগরিকত্বও অর্জন করেন।

তার বাহিনী দেশটির পূর্বাঞ্চলের বিশাল ও সম্পদসমৃদ্ধ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে কৌশলগত বন্দরনগরী বেনগাজিও রয়েছে। রাশিয়া হাফতারকে সমর্থন করছে বলে জানা যায়।

libia-3
১৫ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে লিবিয়ায়।

২০২০ সালে জাতিসংঘের লিবিয়া বিষয়ক সহায়তা মিশন (ইউএনএসএমআইএল) এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ শুরু হয়। এই রোডম্যাপে তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসনকে একীভূত করা, প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন আয়োজন এবং জাতীয় সংলাপের বৈঠক করা।

এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। ২০২১ সালের মে মাসে দুই পক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে রিচার্ড নরলানকে লিবিয়ার বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরিকল্পনা কী?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক উপদেষ্টা মাসাদ বুলুসের নেতৃত্বে ওয়াশিংটন লিবিয়াকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। তবে এর জন্য দুই পক্ষকে একটি একক সরকার গঠনে সম্মত হতে হবে।

ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের উদ্যোগের মূল বিষয় হলো-প্রতিদ্বন্দ্বী দুই সরকার সহযোগিতা করলে লিবিয়ার বিশাল তেলক্ষেত্রে মার্কিন বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে যুক্তরাষ্ট্র। এমন সময় এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যখন দুই প্রশাসনের অর্থায়নের চেষ্টা করা লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটির ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

ত্রিপোলির সরকারের আন্তর্জাতিক বৈধতা থাকলেও হাফতারের বাহিনী দেশটির তেলক্ষেত্র ও তেল টার্মিনালগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।

যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি চুক্তিরও প্রস্তাব দিয়েছে। এর আওতায় দেইবাহ সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন। আর হাফতারের ছেলে এবং এলএনএ-এর সেনাপ্রধান ৩৫ বছর বয়সী সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন।

ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল লিবিয়ায় মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য যেমন বড় সুযোগ রয়েছে, তেমনি ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্যও রয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা।

এর মধ্যে অন্যতম হলো লিবিয়া ও উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই পরিকল্পনার সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এতে লিবিয়ার জনগণের মতামতের যথেষ্ট প্রতিফলন নেই। কেউ কেউ মনে করেন, এই চুক্তি রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ভালো নাও হতে পারে।

এখন পর্যন্ত ফল কী?

অন্তত হাফতার শিবির যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় আগ্রহী, এমন কিছু লক্ষণ দেখা গেছে। খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতার, যার বাবা ২০১১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় অবস্থান করেছিলেন, জুলাইয়ে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।

libia-2
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিবাদে ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই লিবিয়ার ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশনের বিরুদ্ধে ত্রিপোলিতে বিক্ষোভ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ২০২৬ সালের ঐক্যবদ্ধ জাতীয় বাজেট। এপ্রিল মাসে এই বাজেটে স্বাক্ষর করা হয়। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই ছিল দেশটির প্রথম ঐক্যবদ্ধ জাতীয় বাজেট।

তবে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি কিংবা একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠনেরও কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নেই।

তুরস্কের ভূমিকা কী?

আগে জিএনইউকে সমর্থন দিতে লিবিয়ায় সেনা মোতায়েন করা তুরস্কর দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে এবং ‘এক লিবিয়া’ নীতি সামনে এগিয়ে নিচ্ছে।

গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আঙ্কারায় সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করেন। চলতি মাসের শুরুতে ত্রিপোলি ও বেনগাজি-দুই শহরেই সফর করেন ফিদান। সেখানে দেইবাহ ও খলিফা হাফতারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন।

মিসর কী করেছে?

মিসর সরকার ঐতিহ্যগতভাবে সীমান্তের ওপারে অবস্থিত তব্রুক সরকারের নেতা খলিফা হাফতারের সঙ্গে সহযোগিতা করে আসছে।

বুধবার মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি কায়রোতে খলিফা হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তারা লিবিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করার আলোচনা নিয়ে কথা বলেন।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে দেইবাহ কায়রো সফর করেন। একই সময়ে মিসরের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হাসান রাশাদ ত্রিপোলি সফর করেন।

কাতারের অবস্থান কী?

কাতার মূলত লিবিয়ায় জাতিসংঘের মধ্যস্থতার উদ্যোগ ইউএনএসএমআইএল এবং শান্তির জন্য জাতিসংঘের রোডম্যাপকে সমর্থন করে আসছে।

জিএনইউ-এর সঙ্গে কাতারের সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে দেশটি লিবিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে।

এপ্রিল মাসে কাতার ও অন্যান্য কয়েকটি দেশ ২০২৬ সালের ঐক্যবদ্ধ বাজেটকে স্বাগত জানায়। কাতার, মিসর, ফ্রান্স, জার্মানি ও আরও কয়েকটি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে লিবিয়ার সব পক্ষকে জাতিসংঘের রোডম্যাপ অনুসরণ করার আহ্বান জানায়। এর লক্ষ্য লিবিয়ার নেতৃত্বে এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, যার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ সরকারব্যবস্থা ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এমআর