Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

‘মক্কা চুক্তিতে’ মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় না সৌদি আরব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১২ আগস্ট ২০২৬, ১০:০২ পিএম

সম্প্রতি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী তিন দেশ- সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই জোটে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তুরস্কের পক্ষ থেকে তীব্র চাপ থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের বিরোধিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।  

আলোচনা সম্পর্কে অবগত তিনটি সৌদি সূত্রের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। 

সূত্রগুলোর মধ্যে সৌদি রাজ পরিবারের একজন সাবেক জেষ্ঠ্য উপদেষ্টাও রয়েছেন, যিনি বলেছেন যে রিয়াদ চায় না মিসর এই চুক্তিতে যোগ দিক, ‘অন্তত আপাতত না’।

বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনটি সূত্রই জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং রিয়াদের এই বিশ্বাস যে মিসর এখন আর আগের মতো কৌশলগত বা সামরিক গুরুত্ব বহন করে না। 

আরও পড়ুন

পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে পারমাণবিক সুরক্ষা দেবে?

এরআগে গত শুক্রবার পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, যা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ‘আর্টিকেল-৫’ এর মতো একটি যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

সৌদি কর্মকর্তারা এটিকে যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করার একটি ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যদিও এই চুক্তিতে কার্যপ্রণালী, নির্দিষ্ট কার্যপ্রক্রিয়া এবং সংকটের সময় যৌথ সামরিক সহায়তা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। 

সূত্রমতে, রিয়াদ ও কায়রোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণেই মিসরের প্রবেশের বিরোধিতা করার সৌদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

সূত্র বলেছে, ২০১৩ সালের অভ্যুত্থানে বর্তমান প্রেসিপেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ক্ষমতা দখলের পর সৌদি আরবই ছিল তার সরকারের সবচেয়ে বড় আর্থিক সমর্থক। প্রাথমিকভাবে কায়রোর দুর্বল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে দেশটি প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতে পারস্পরিক সমর্থনের অভাবকে রিয়াদ হতাশাজনক বলে মনে করে।

একটি সূত্র ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে মিসরের ‘ন্যূনতম ও অনির্ভরযোগ্য’ ভূমিকা এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে তাদের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আবুধাবির সমর্থন দেওয়া নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধের পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

অন্য দুটি সূত্র উল্লেখ করেছে, ইরানের হামলার জবাবে মিসর আবুধাবিতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান পাঠায় এবং যুদ্ধ চলাকালীন প্রেসিডেন্ট সিসি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করলেও, সৌদি আরবের প্রতি এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কায়রোর এই পদক্ষেপকে ভালোভাবে নেয়নি রিয়াদ।  

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এর আরেকটি কারণ হলো রিয়াদ আমিরাতের বেশ কিছু নীতিকে মিসরের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখে। এর মধ্যে রয়েছে সোমালিল্যান্ডে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পৃক্ততা, ইসরায়েলের সঙ্গে এর কৌশলগত সম্পর্ক, গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম নিয়ে বিরোধের সময় ইথিওপিয়াকে সমর্থন এবং সুদানে র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) সহায়তা।

একটি সূত্র জানিয়েছে, আবুধাবির সঙ্গে কায়রোর অব্যাহত সম্পৃক্ততা কৌশলগত অংশীদার হিসেবে মিসরের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে রিয়াদের সন্দেহ আরও গভীর করেছে।

অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, রিয়াদ এখন আর মিসরকে কোনো সমপর্যায়ের কৌশলগত অংশীদার না ভেবে কেবল উপসাগরীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল দেশ হিসেবে দেখছে।

সৌদি রাজ পরিবারের সাবেক ওই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার মতে, মিসর ঐতিহাসিকভাবে রাজতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল, অথচ বিনিময়ে তেমন কিছুই দেয়নি।

তিনি বলেন, ‘মিসর বরাবরই আমাদের ওপর, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল, এবং বিনিময়ে কিছুই দেয় না, শুধু নিয়েই যায়, কোনো প্রতিদান ছাড়াই’।

এদিকে শনিবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইঙ্গিত দিয়েছেন, মিসর সদস্য দেশগুলোর স্বাভাবিক অংশীদার এবং প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলো সমাধান হয়ে গেলে তাদের জোটের অংশ হতে না পারার কোনো কারণ নেই।

পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি তুর্কি সূত্র জানায়, আঙ্কারা এই চুক্তিতে মিশরকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর অংশগ্রহণের প্রস্তাবও দিয়েছিল। তবে কায়রো এখনি এই জোটে যোগ দিতে প্রস্তুত নয়, তখন অন্যান্য দেশগুলো তাকে ছাড়াই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে সৌদি সূত্রগুলো এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে যে, মিশর নিজেই চুক্তিটিতে যোগ দেওয়া আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সূত্র: মিডল ইষ্ট আই

এমএইচআর